ফসলের উৎপাদন বাড়াতে দেশীয় প্রযুক্তি, বাকৃবির ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’

ফসলের রোগ দমন করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাসায়নিক ছত্রাকনাশকের ব্যবহার কমাতে দেশীয় প্রযুক্তিতে ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ নামে জৈব ছত্রাকনাশক উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। প্রায় ২৫ বছরের গবেষণায় দেশীয় উৎসের ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপ্যারেলাম ছত্রাক ব্যবহার করে তৈরি এই বায়োফরমুলেশন একই সঙ্গে জৈব ছত্রাকনাশক ও জৈব সার হিসেবে কাজ করে।
গবেষকদের দাবি, বিভিন্ন ফসলে এর প্রয়োগে উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করা সম্ভব।
প্রতিবছর ২ অক্টোবর ‘জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস’ পালিত হয়। দিবসটি উদ্যাপনে এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও দক্ষতার সমন্বয়’। প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এ প্রযুক্তিকে কৃষিতে সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন গবেষকরা।
মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় টমেটোতে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ, আলুতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, ধানে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ, গমে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং চা গাছে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। মরিচ ও ডালজাতীয় ফসলে বীজবাহিত ছত্রাকজনিত রোগ ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দমন করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানিয়েছেন গবেষকরা।
গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে মাঠপর্যায়ে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রযুক্তিটি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধান গবেষক ও উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল, কৃষি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন, ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহেদ রেজাসহ গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা।
গবেষণায় টমেটো, আলু, বেগুন, ঢেঁড়স, মরিচ, শসা, লাউ, কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি, ডালজাতীয় ফসল, ধান, গম, চা ও পান চাষে এর কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। ফিউজারিয়াম উইল্ট, রুট রট, স্ক্লেরোটিয়াম ব্লাইট ও পাতার দাগসহ বিভিন্ন ছত্রাকজনিত রোগ দমনে পণ্যটি কার্যকর বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল বলেন, যেহেতু এটা জৈব ফার্টিলাইজার, মাঠপর্যায়ে আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কৃষকদের কাছে সরবরাহ করছি। ব্যাপক সরবরাহের চাহিদা আমরা কৃষকদের কাছ থেকে পাচ্ছি। বিশেষ করে পান, টমেটো, আলু, মরিচ, ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন সবজিতে ভালো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। যারা আমাদের এই পণ্য ব্যবহার করেছেন, তারা পণ্য শেষ হওয়ার পরই আমাদের কাছে পুনরায় চেয়ে থাকেন। প্লান্টগার্ড নামের একটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই পণ্যটি সারা দেশের কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত মোট বালাইনাশকের প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশই রাসায়নিক ছত্রাকনাশক। এসব ছত্রাকনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার শুধু ক্ষতিকর ছত্রাকই নয়, মাটিতে থাকা উপকারী অণুজীব ও ছত্রাকও ধ্বংস করে। ফলে পরিবেশ, মাটির স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প হিসেবে ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা একই সঙ্গে জৈব ছত্রাকনাশক ও জৈব সার হিসেবে কাজ করে।
কার্যকারিতার বিষয়ে অধ্যাপক মঞ্জিল বলেন, পিজি-ট্রাইকোডার্মার প্রতি গ্রামে ন্যূনতম ২০ লাখ জীবন্ত ট্রাইকোডার্মা স্পোর রয়েছে। এটি উদ্ভিদের শিকড়ের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে, পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ায় এবং মাটির জৈবিক স্বাস্থ্য উন্নত করে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনে এবং প্রাকৃতিক উপায়ে রোগ ও পোকামাকড় দমনে সহায়তা করে। সহজে প্রয়োগযোগ্য হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী ও ব্যবহারবান্ধব প্রযুক্তি।
তিনি জানান, পিজি-ট্রাইকোডার্মা বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। নিবন্ধন সম্পন্ন হলে কৃষক পর্যায়ে এর ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে। দেশীয় উৎসের এই প্রযুক্তি কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানো, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই গবেষক আরও বলেন, এ-সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি ‘মালয়েশিয়ান জার্নাল অব সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার’ জার্নালে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল আরও বলেন, দেশে ব্যবহৃত বালাইনাশকের বড় একটি অংশ রাসায়নিক ছত্রাকনাশক। এর অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটির উপকারী অণুজীব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে পিজি-ট্রাইকোডার্মা উদ্ভাবন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গবেষণার শুরুতে দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মাটি ও রাইজোস্ফিয়ার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেখান থেকে শতাধিক ট্রাইকোডার্মা ছত্রাক পৃথক করে দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। পরে বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে অভিযোজিত ও কার্যকর ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপ্যারেলাম নির্বাচন করে এর ভিত্তিতে বায়োফরমুলেশন তৈরি করা হয়।
কৃষি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বলেন, পিজি-ট্রাইকোডার্মা জৈব ছত্রাকনাশকের কোনো ক্ষতিকর দিক নেই। এটি শতভাগ নিরাপদ। অন্যান্য ছত্রাকনাশক বা যেকোনো কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রে ফসল কমপক্ষে সাত দিন পর সংগ্রহ করতে হয় এবং রাসায়নিক প্রয়োগের পর কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা ওই জমিতে কৃষক প্রবেশ করতে পারেন না। তবে আমাদের এই পণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই। এতে ক্ষতিকর কোনো উপাদান নেই। ট্যালকম পাউডারের সঙ্গে ট্রাইকোডার্মা ছত্রাক ব্যবহার করে এটি বাজারজাত করা হয়েছে। ফলে এটি সম্পূর্ণভাবে জৈব; এতে ক্ষতিকর কোনো উপাদান নেই।
তিনি আরও জানান, এই পণ্যটি দূষিত জমিতে প্রয়োগ করলে সেখানে উদ্ভিদের ভারী ধাতু গ্রহণ কমায় এবং পুষ্টি উপাদান গ্রহণ বৃদ্ধি করে। ফলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। বাংলাদেশে ৪০ হাজার মেট্রিক টন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে মাত্র দুই থেকে পাঁচ শতাংশ বায়োফার্টিলাইজার। তাই আমাদের পণ্যটি দেশের রাসায়নিক ছত্রাকনাশকের বিকল্প জৈব ছত্রাকনাশক হিসেবে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। এটি নার্সারি বেড শোধন ও মাটি শোধনের জন্য মাটির সঙ্গে মিশিয়ে, বীজের সঙ্গে মিশিয়ে এবং সরাসরি গাছে স্প্রে করা যায়।
শুধু ফসল উৎপাদন নয়, মৎস্য উৎপাদনেও পণ্যটির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহেদ রেজা। তিনি বলেন, মাছের অব্যবহৃত খাদ্য ও মল পানির গুণগত মান কমিয়ে দেয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক এ পণ্য ব্যবহারে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন বাড়া এবং অ্যামোনিয়ার পরিমাণ কমার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে মৎস্য খাতে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা প্রয়োজন।
