
দেশের নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে একসময় প্রচুর পাওয়া যেত দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ। কিন্তু জলাশয় সংকোচন, দূষণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন, অতিরিক্ত আহরণসহ নানা কারণে এসব মাছের অনেক প্রজাতিই এখন হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে। বিলুপ্তপ্রায় এসব দেশীয় মাছকে আবার জলজ পরিবেশ ও উৎপাদনের ধারায় ফিরিয়ে আনতে নীলফামারীর সৈয়দপুরে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) স্বাদুপানি উপকেন্দ্র। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ইতিমধ্যে এ উপকেন্দ্র থেকে ১২টি বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছের পোনা উৎপাদনে সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
দেশের মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে গবেষণার জন্য জাতীয় পর্যায়ের একমাত্র প্রতিষ্ঠান বিএফআরআই। ১৯৮৪ সালে ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ময়মনসিংহে সদর দপ্তর অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানের গবেষণা কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলজ জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মৎস্যসম্পদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পাঁচটি কেন্দ্র ও পাঁচটি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নীলফামারীর সৈয়দপুরের স্বাদুপানি উপকেন্দ্র এরমধ্যে একটি।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে ৮৩টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটটি। এসব প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ সংরক্ষণ, উন্নত জাত উদ্ভাবন, দেশীয় মাছের জিনপুল সংরক্ষণ, পুকুরভিত্তিক মাছ চাষের উন্নয়ন, মাছের রোগবালাই প্রতিকার ও দমন, ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং মেরিকালচার ও অপ্রচলিত মৎস্যসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি।
উত্তরাঞ্চলের মৎস্য ও মৎস্যজাত বিষয়ে গবেষণার জন্য ২০০৬ সালে বিএফআরআইয়ের স্বাদুপানি কেন্দ্রের অধীনে নীলফামারীর সৈয়দপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্বাদুপানি উপকেন্দ্র। এই উপকেন্দ্র থেকে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, আত্রাই ও এসব নদীর অববাহিকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য উত্তরবঙ্গের নদ-নদী ও জলাভূমি থেকে হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় মাছের জিনপুল সংরক্ষণ, কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন। পাশাপাশি সফলভাবে কৃত্রিম প্রজনন করা মাছের উন্নত চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন এবং তিস্তা ও তিস্তা অববাহিকার জলজ জীববৈচিত্র্য নিয়েও গবেষণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছের সংকটের চিত্রও গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (IUCN) এর ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৪ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ বিপন্নের তালিকায় ছিল। এর পরবর্তী কয়েক বছরের গবেষণায় বিএফআরআই ৪০ প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবনে সফল হয়েছে।

এর মধ্যে নীলফামারীর সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্র থেকে ১২টি দেশীয় মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনে সাফল্য এসেছে। এসব মাছের মধ্যে রয়েছে টেংরা, লইট্যা টেংরা, গুতুম, বৈরালী, খলিশা, বালাচাটা, নাটুয়া, আঙ্গুস, কুর্শা, নারকেলি চেলা ও জারুয়া। গবেষকদের মতে, এসব প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে আরও বিস্তৃত করা গেলে একদিকে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে চাষিদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
দীর্ঘদিন ধরে হারিয়ে যেতে বসা জারুয়া মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন সৈয়দপুর উপকেন্দ্রের গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একসময় তিস্তা, আত্রাইসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জলাশয়ে এ মাছ পাওয়া গেলেও আবাসস্থল সংকোচন, অতিরিক্ত আহরণসহ নানা কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে মাছটি। গবেষণার মাধ্যমে প্রজনন ও পোনা উৎপাদনের কৌশল উদ্ভাবনের ফলে নিয়ন্ত্রিতভাবে এ মাছের বংশবিস্তার ও সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিলুপ্তপ্রায় গোটালি মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনেও সাফল্য এসেছে। একসময় উত্তরাঞ্চলের নদী-নালা ও স্বচ্ছ জলাশয়ে পাওয়া গেলেও বর্তমানে মাছটির প্রাপ্যতা অনেক কম। কৃত্রিম প্রজননের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে গোটালি মাছকে পুনরায় চাষের আওতায় আনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের কার্যক্রম শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় চাষিদের পুকুরের পানি পরীক্ষা, মাছের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা, আধুনিক মৎস্য চাষ প্রযুক্তি বিষয়ে পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে এ উপকেন্দ্র থেকে তিনটি গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরবঙ্গের তিস্তা, আত্রাই ও অববাহিকার নদীগুলোতে হারিয়ে যেতে বসা মাছের জিনপুল সংরক্ষণ এবং বিলুপ্তপ্রায় মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন; কৃত্রিম প্রজননে সফল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের উন্নত চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন; এবং তিস্তা ও তিস্তা অববাহিকার নদীগুলোর জলজ জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা।
দেশীয় মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সৈয়দপুর উপকেন্দ্রের আগের সাফল্যেরও স্বীকৃতি রয়েছে। টেংরা মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবনের জন্য ২০১৭ সালে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে এ উপকেন্দ্র রৌপ্য পদক লাভ করে।
গবেষকদের মতে, বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি এসব মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনের প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়বে। একই সঙ্গে জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা, মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ এবং মৎস্য খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন, জলাশয় ভরাট ও দূষণ এবং অতিরিক্ত আহরণের কারণে দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতির আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে। ফলে শুধু প্রাকৃতিকভাবে এসব মাছের ফিরে আসার অপেক্ষায় না থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও জিনপুল সংরক্ষণের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ক্ষেত্রে সৈয়দপুরের স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের গবেষণা দেখাচ্ছে, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে হারিয়ে যেতে বসা মাছের প্রজাতিকেও আবার উৎপাদনের ধারায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। ফলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য শুধু শিল্প বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেই নয়, মৎস্য গবেষণা ও জলজ সম্পদ সংরক্ষণেও বাস্তব অর্থ বহন করছে।
এ বিষয়ে মৎস্যচাষি হাসান আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, সৈয়দপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে তার পুকুরে বেশ কয়েকবার মাছ চাষ করা হয়েছে। নতুন একটি মাছ তাকে দেওয়া হয়েছিল এবং মাছ চাষের সব নিয়মকানুন শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী তিনি মাছকে খাদ্য ও ওষুধ দিয়েছেন। পরে মোটামুটি ভালো ফলাফল পেয়েছেন। তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৃষকের মাধ্যমে ভিন্ন ধরনের মাছ নিয়ে গবেষণা চালান।
সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শ্রীবাস কুমার সাহা এশিয়া পোস্টকে বলেন, উত্তরাঞ্চলের অনেক দেশীয় মাছ বর্তমানে বিভিন্ন কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব মাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে তারা কাজ করছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদনে সফলতা পেয়েছেন। এসব প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে চাষিদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
