ইনকিউবেটরের আগুনে ঝলসে গেল ৫ ঘণ্টা বয়সি নবজাতক

রাজধানীর চাঁনখারপুলের রয়েল কেয়ার অ্যান্ড সার্জিক্যাল হাসপাতালে ইনকিউবেটরে আগুন লাগার ঘটনায় পাঁচ ঘণ্টা বয়সি এক নবজাতকের শরীরের প্রায় ৯৫ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
শনিবার (৭ নভেম্বর) ভোরে এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে শিশুটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের এনআইসিইউতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং তাদের মারধরের অভিযোগ তুলেছেন নবজাতকের স্বজনরা।
নবজাতকের বাবা বগুড়ার কাহালু উপজেলার পলি বগুই গ্রামের বাসিন্দা মো. রাব্বানী জানান, শনিবার ভোর ৪টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২১২ নম্বর ওয়ার্ডে তার সন্তানের জন্ম হয়। এরপর তার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত এনআইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে ঢামেকের নিজস্ব এনআইসিইউতে কোনো শয্যা খালি না থাকায় সেখানকার এক চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালের এক ওয়ার্ড বয়ের মাধ্যমে ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে সন্তানকে চাঁনখারপুলে অবস্থিত রয়েল কেয়ার অ্যান্ড সার্জিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি।
রাব্বানীর অভিযোগ, হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক ভর্তিপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই নবজাতককে এনআইসিইউর একটি বেডে রাখা হয়। এ সময় তিনি ও তার ভাতিজা রেজাউল ভর্তিসংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ চিৎকার শুনে ওয়ার্ডে গিয়ে তারা দেখতে পান, নবজাতককে রাখা ইনকিউবেটরে আগুন জ্বলছে এবং তার শরীরেও আগুন লেগেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার পর হাসপাতালের দায়িত্বশীল স্টাফদের কাউকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে স্বজনদের চেষ্টায় আগুন নেভানো হয়। হাসপাতালের কয়েকজন কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে নবজাতককে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
অগ্নিদগ্ধ সন্তানকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা আবার রয়েল কেয়ার হাসপাতালে ফেরত পাঠান বলে অভিযোগ করেন রাব্বানী। এ ছাড়া ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে গেলে হাসপাতালের লোকজন তাকে ও তার স্বজনদের মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাব্বানী বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে সিট না পেয়ে বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। কিন্তু ওদের অবহেলায় আমার পাঁচ ঘণ্টার বাচ্চার শরীরটা পুইড়া গেল। আমি এই কসাইদের বিচার চাই।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রয়েল কেয়ার হাসপাতালের ইনচার্জ মো. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি দাবি করেন, নবজাতককে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি করার আগেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা তার। এতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
মারধরের অভিযোগ প্রসঙ্গে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নবজাতকটির স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের কর্মীদের মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সেখানে থাকা অন্য রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে মূলত বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল।
একই হাসপাতালের রিসেপশনিস্ট সানজিদা বলেন, ভর্তিপ্রক্রিয়া চলার সময়ই শর্টসার্কিট থেকে আগুনের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই তারা নিজেদের উদ্যোগে শিশুটির স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের কর্মীদেরও জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠান। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজও তাদের কাছে রয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. তাজকিয়া হক জানান, নবজাতকটির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তার শরীরের প্রায় ৯৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। বিষয়টি স্বজনদের বারবার জানানো হলেও তারা তা মেনে নিতে পারছেন না এবং চিকিৎসা কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢামেক হাসপাতালের ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ড বয়রা জানান, হাসপাতালে এনআইসিইউর শয্যা খালি না থাকায় অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। তাদের দাবি, এ ঘটনার দায় রয়েল কেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানান, পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। নবজাতকটি বর্তমানে ঢামেক হাসপাতালের ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন। পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

