logo

চীনের এক হাসপাতালে বছরে ৩০০ বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট, বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে

আজাদুল আদনান
আজাদুল আদনান, চীন থেকে ফিরে
চীনের এক হাসপাতালে বছরে ৩০০ বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট, বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে
বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস সরকারি হাসপাতালে ব্রিফ করছেন চিকিৎসক। গত ২৫ অক্টোবর তোলা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

চীনের গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস সরকারি হাসপাতালে প্রতি বছর ৩০০ থেকে ৩৫০টি বোনম্যারো (অস্থিমজ্জা) ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়। বাংলাদেশে এই সংখ্যা বছরে ৬০ থেকে ৭০টি বলে জানিয়েছেন এভারকেয়ার হসপিটালের একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক।

দেশে সরকারের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে এই চিকিৎসা এখনও শুরু করা যায়নি। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আমীন লুৎফুল কবীর এশিয়া পোস্টকে বলেন, দেশে একটি নিবেদিত দল ও তরুণ হেমাটোলজিস্টদের (রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ) বড় একটি অংশ প্রস্তুত রয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দুর্বলতা ও প্রকল্প জটিলতার কারণে বিএমইউতে এই জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা চালু হচ্ছে না।

বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টে রোগীর শরীরে সুস্থ স্টেম সেল, অর্থাৎ রক্তকোষ তৈরির মূল কোষ বসানো হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই পদ্ধতি হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা এইচএসসিটি নামেও পরিচিত। রক্তের ক্যানসারসহ কয়েকটি রোগে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়।

সম্প্রতি চীন সফর করেন ৪০ বাংলাদেশি সাংবাদিক। তাদের সবাই বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সদস্য। গত ২৫ অক্টোবর গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন তারা।

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক চেংজুয়ান ঝং। তিনি এশিয়া পোস্টকে জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে বছরে ৩০০ থেকে ৩৫০টি হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট (এইচএসসিটি) করা হয়। রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য ট্রান্সপ্ল্যান্ট ওয়ার্ডে রয়েছে ‘গ্রেড ১০০ ল্যামিনার-ফ্লো’ সুবিধাসম্পন্ন ৩০টি কক্ষ। এসব কক্ষে বাতাসে ধুলিকণা ও জীবাণু নিয়ন্ত্রণে রাখার বিশেষ ব্যবস্থা থাকে।

চেংজুয়ান ঝং বলেন, ‘প্রতিবছর অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় প্রায় ১০০টি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়। এক্ষেত্রে বেঁচে থাকার হার ৯০ শতাংশ। শিশুদের বিরল ক্যানসার জুভেনাইল মায়েলোমোনোসাইটিক লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার ৯০ শতাংশের বেশি।’

ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসায় গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস সরকারি হাসপাতালে রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা আব্দুল্লাহ হাসান নাসিফ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসায় গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস সরকারি হাসপাতালে রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা আব্দুল্লাহ হাসান নাসিফ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া এমন রোগ, যাতে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত নতুন রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। জুভেনাইল মায়েলোমোনোসাইটিক লিউকেমিয়া শিশুদের একধরনের বিরল রক্তের ক্যানসার।

১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস সরকারি হাসপাতালের বয়স ১২৭ বছর। এর তিন শাখায় ২ হাজার ৯৭০টি শয্যা রয়েছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৩০ লাখ রোগী এসব শাখায় চিকিৎসা নেন। সেবা দেওয়া হয় হেমাটোলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, ইউরোলজি ও জেরিয়াট্রিকসসহ বিভিন্ন বিভাগে।

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে স্টেট কাউন্সিলের (চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক সংস্থা) বিশেষ সরকারি ভাতা পাওয়া ১০ জন বিশেষজ্ঞ ও সহস্রাধিক জ্যেষ্ঠ পেশাজীবী রয়েছেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ৮৩ জন গবেষক এখানে যুক্ত আছেন।

চেংজুয়ান ঝং বলেন, ‘স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি কোষভিত্তিক চিকিৎসা ও জিন থেরাপি নিয়ে কাজ চলছে। থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগের চিকিৎসায় জিন থেরাপির ক্লিনিক্যাল প্রয়োগ হচ্ছে।’

পরিদর্শনের সময় বিএইচআরএফ সদস্যরা হাসপাতালটির বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগ, চিকিৎসা কাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য গড়ে তোলা ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেন। সফরের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, এ খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং উত্তরণের উপায় চিহ্নিত করা।

পরিদর্শন শেষে বিএইচআরএফ সভাপতি প্রতীক ইজাজ বলেন, ‘জনবহুল বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী হওয়া দরকার, তার অনেকটা চীনের এই সরকারি হাসপাতাল বলে দেয়। তারা পারলে কেন আমরা বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টে পিছিয়ে থাকব? চীনের স্বাস্থ্য খাত প্রযুক্তিতে কয়েক ধাপ এগিয়ে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সমাধানে প্রয়োজনে চীনের এ হাসপাতালের সহযোগিতা নিয়ে আমরা এগোতে পারি।’

হাসপাতালটিতে বাংলাদেশি রোগীরাও চিকিৎসা নেন। তাদের একজন রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা আব্দুল্লাহ হাসান নাসিফ (রবিন)। গত বছরের অক্টোবরে তার স্ত্রী রেহনুমা তারান্নুম স্নিগ্ধার মাল্টিপল মায়েলোমা (রক্তের ক্যানসার) শনাক্ত হয়।

চিকিৎসার জন্য স্ত্রীকে ভারতে নেওয়ার চেষ্টা করেন রবিন। তবে ভিসা জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। পরে চীনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখান থেকে নিয়ে যান গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস সরকারি হাসপাতালে। সেখানে সম্প্রতি স্নিগ্ধার বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছে।

স্ত্রীর চিকিৎসায় প্রায় ৪৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান রবিন। চীনে চিকিৎসার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তার মূল্যায়ন, ‘প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধায় হাসপাতালটি বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠানের সমপর্যায়ের, এমনকি কিছুটা এগিয়ে। এখানকার চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফরা অত্যন্ত বন্ধুসুলভ। শুধু চিকিৎসা নয়, থাকার জায়গা খোঁজা, বাজার করা ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার মতো দৈনন্দিন কাজেও তারা সহযোগিতা করেন। মুসলিম রোগী ও স্বজনদের জন্য আলাদাভাবে রান্নার ব্যবস্থা আছে।’

ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর শরীর কতটা সাড়া দিয়েছে, তা পর্যালোচনায় দুই সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানান রবিন। সেই মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করছে স্নিগ্ধার পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা।

বিএইচআরএফ সদস্যদের ব্রিফ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বিএইচআরএফ সদস্যদের ব্রিফ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

চীনে যখন বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের এমন অভিজ্ঞতা, সেখানে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে? এমন প্রশ্নে বিএমইউর অধ্যাপক ডা. আমীন লুৎফুল কবীর বলেন, ‘বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের জন্য বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রজেক্ট আসে, কিন্তু প্রজেক্টগুলো চলে যায়। কংক্রিট আকারে কখনও প্রকল্প হিসেবে আসেনি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দুর্বলতার কারণে এটি আলোর মুখ দেখে না। এ ছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও এগুলোতে প্রভাব পড়ে।’

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর অন্তত ১ হাজার বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। এভারকেয়ার হসপিটালের হেমাটোলজি অ্যান্ড স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও কোঅর্ডিনেটর ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ্ বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬০ থেকে ৭০টির মতো বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছে। কিন্তু রোগীদের চাহিদা এর চেয়ে অনেক বেশি।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরে এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর থেকে আরেকটা সক্রিয়তা তৈরি হয়। আমরা প্রজেক্ট দেই, এমএ পাস হয়, ডিপিপি দিই, ফিজিবিলিটি স্টাডি করি, সবকিছুই আছে। শুনি বাজেট দ্বিগুণ হয়ে গেছে, কিন্তু পরে আর হয় না। লিভার ট্রান্সপ্লান্ট, স্টেম সেল থেরাপি; এগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারও তৎপর ছিল।’

সরকারের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে লিভার (যকৃৎ) ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছে। তবে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট এখনও শুরু করা যায়নি।

অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার পরও কাজের অগ্রগতি না হওয়া নিয়ে ডা. আমীন লুৎফুল কবীর বলেন, ‘সুপার স্পেশালাইজডে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হচ্ছে। লিভার ও বোনম্যারোর জন্য অ্যাসাইন করা আলাদা জায়গা আছে। গত সাত-আট বছর ধরে ওই জায়গাটা অ্যাসাইন করা আছে, কিন্তু এখনও শুরু করা যায়নি। আমাদের প্রায় ২০০-এর কাছাকাছি হেমাটোলজিস্ট আছে। একটি তরুণ গ্রুপ তৈরি হয়ে গেছে, যাদের আমরা সহজেই কাজে লাগাতে পারি।’

পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ্ এশিয়া পোস্টকে বলেন, চিকিৎসক, নার্স, ট্রান্সফিউশন বিশেষজ্ঞ, অন্যান্য লজিস্টিক কর্মীসহ দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে।

তিনি জানান, বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইউনিট স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিশেষায়িত পরীক্ষা, এইচএলএ টাইপিং এবং রক্তে ওষুধের মাত্রা পর্যবেক্ষণের মতো কাজে সক্ষম ল্যাবরেটরির বড় ঘাটতি আছে। এ ছাড়া রক্ত সঞ্চালন সেবা বা ট্রান্সফিউশন মেডিসিন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন দরকার।

তার মতে, ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার গড়ে তোলার আগে একটি উপযুক্ত লিউকেমিয়া সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কারণ একজন ক্যানসার রোগী সফলভাবে রেমিশনে যাওয়ার পরই বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের দিকে যান।

ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ্ জানান, সেন্ট্রাল লাইন স্থাপন, নিউট্রোপেনিক কেয়ার ও আইসোলেশন হলো লিউকেমিয়ার সফল চিকিৎসার মূল চ্যালেঞ্জ। এসবের জন্য দক্ষ হেমাটোলজিস্ট প্রয়োজন।

সফর শেষে বাংলাদেশ ও চীনের স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন বিএইচআরএফ নেতারা। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ বলেন, ‘বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়লে চিকিৎসক বিনিময়, যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে শুধু বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগই বাড়বে না, বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

মিছবাহ পাটওয়ারী

সম্পাদনা

মিছবাহ পাটওয়ারী

সহকারী বার্তা সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট