logo

সংকটের মধ্যেও বসিয়ে রাখা হয়েছে ৮৪৫ চিকিৎসককে

• সারা দেশে ওএসডি ৮ হাজার ৫৬১ চিকিৎসক

• প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কারণে ওএসডি ৮৪৫ জন

• হাসপাতালে সংযুক্তি ও উচ্চশিক্ষার জন্য ওএসডি ৭ হাজার ৭১৬

• কাজ ছাড়াই উত্তোলন করছেন বেতন-ভাতা

সংকটের মধ্যেও বসিয়ে রাখা হয়েছে ৮৪৫ চিকিৎসককে
কোলাজ ছবি: এশিয়া পোস্ট

চিকিৎসক সংকটে ভুগছে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো। জনবল সংকটে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যেই ৮৪৫ জন চিকিৎসককে কোনো দায়িত্ব না দিয়ে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে রাখা হয়েছে। কোনো কাজ ছাড়াই নিয়মিত চলছে তাদের বেতন-ভাতা। শৃঙ্খলা ভঙ্গ, পদ জটিলতা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় ওএসডি করা হয়েছে এই চিকিৎসকদের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে বর্তমানে ৮ হাজার ৫৬১ জন চিকিৎসক ওএসডি রয়েছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোর্সে অধ্যয়নরত ৪ হাজার ১৯৭ জন। সংযুক্তিমূলক ওএসডি হিসেবে বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত ৩ হাজার ৫১৯ জন। বাকি ৮৪৫ জনকে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কারণে ওএসডি করা হয়েছে।

চিকিৎসক ঘাটতির মধ্যে এত বেশি সংখ্যক কর্মকর্তাকে ওএসডি করে বসিয়ে রাখার প্রভাব পড়ছে হাসপাতালগুলোতে। দেশের অন্তত ১৯৬ উপজেলায় চিকিৎসাসেবা প্রায় ভেঙে পড়েছে। অন্য উপজেলাগুলোতেও ঘাটতির কারণে রোগীদের একটি বড় অংশকে জেলা সদর বা বিভাগীয় হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংযুক্তিমূলক ওএসডির হার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কারণে ওএসডি হওয়া চিকিৎসকদের কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ, দীর্ঘদিনের অনিয়মসহ নানা কারণে বেশকিছু চিকিৎসক ওএসডি হিসেবে আছেন। এর মধ্যে ১০ জনের মতো সিভিল সার্জনও রয়েছেন। তাদের বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়ার সুযোগ নেই। যেহেতু অপরাধ করেছে, শাস্তি তো কিছু পেতে হবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার তাদেরকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে। যেহেতু সাত মাসের একটা সরকার, সবকিছু ঠিকঠাক হতে কিছুটা সময় লাগছে।’

পদ বিলুপ্তি ও পদায়ন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন পদ্ধতি বা অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বাতিল করা হয়। ফলে এর অধীনস্থ হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট, প্রোগ্রাম ম্যানেজার (পিএম) ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজারের (ডিপিএম) পদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। এসব পদে আগে যেসব কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন, তারা আগের মতোই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। কিন্তু তাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মস্থল নেই।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছু বিভাগের পরিচালক, উপপরিচালক ও হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ককে ওএসডি করা হয়। তারা এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত। তবে হাতে কোনো কাজ নেই।

২১তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা ডা. ইদ্রিস হায়দার (ছদ্মনাম)। এই কর্মকর্তা জানান, সব ধরনের দক্ষতা থাকার পরও রাজনৈতিক কারণে আওয়ামী লীগ আমলে দীর্ঘ সময় ঢাকার বাইরে কাজ করতে হয়েছে। পরে অনেক চেষ্টায় জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের একটি পদে বসার সুযোগ পান।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি বিভাগের লাইন ডিরেক্টর করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে লাইন ডিরেক্টর পদ বিলুপ্ত হলে ওএসডি হন। এখনও পর্যন্ত কোথাও পদায়ন হয়নি তার।

ডা. ইদ্রিস হায়দার বলেন, ‘জনগণের টাকায় আমাদের বেতন হচ্ছে। অথচ তাদের সেবা দেওয়া থেকে দক্ষ চিকিৎসকদের বঞ্চিত রাখা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘একজন কর্মকর্তা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন, জেলা সদর হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও প্রদান করেন। পাশাপাশি জনশক্তি পরিচালনা করেন। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেন, উন্নয়নকাজ সম্পাদন করেন। এতে তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দুটোই বাড়ে। নবীন কর্মকর্তাদের এই দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা থাকে না। অথচ, সরকার অভিজ্ঞদের অকারণে ওএসডি করে রেখেছে। এতে মানুষ দক্ষ কর্মকর্তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

সামাজিক অস্বস্তি

বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সময়ে সিভিল সার্জন ছিলেন এক কর্মকর্তা। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাকে ওএসডি করা হয়।

জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে কোনো সেবা দিতে না পেরে হতাশ এই কর্মকর্তা। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক যে, জনগণের টাকায় বেতন পাচ্ছি, কিন্তু তাদের সেবা দিতে পারছি না।’

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কখনও সরাসরি রাজনৈতিক দল করিনি। অথচ আমাকে ওএসডি করা হয়েছে। এই ধারা পরিবর্তন হওয়া উচিত। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে ওএসডি করা ইতিবাচক কিছু বয়ে আনে না। একজন চিকিৎসকের এভাবে বসে থাকা বিব্রতকর।’

তিনি বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনরা যখন জিজ্ঞেস করেন কেন ওএসডি করা হয়েছে, তখন জবাব দিতে পারি না। প্রতিনিয়ত সামাজিকভাবে হেয় হতে হচ্ছে।’

সংযুক্তি ও উচ্চশিক্ষায় ওএসডি বাড়ানোর পরিকল্পনা

স্বাস্থ্য খাতে প্রশাসনিক ওএসডির বাইরে আরও দুই ক্যাটাগরিতে ওএসডি হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি হয় ডক্টর অব মেডিসিন (এমডি), মাস্টার অব সার্জারি (এমএস) ও এফসিপিএসের মতো স্নাতকোত্তর কোর্সের ছুটিতে। এরপর রয়েছে হাসপাতালে সংযুক্তি।

যেসব উপজেলা, জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী বেশি, কিন্তু পদ না থাকায় নিয়োগ দেওয়া যায় না, সেখানে চিকিৎসকদের সংযুক্ত করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর এ দুই ক্যাটাগরিতে ৭৭২ জনকে ওএসডি করা হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের বিভিন্ন কোর্সে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত হিসেবে ওএসডি হয়েছেন ৪১৫ জন। বাকি ৩৫৭ জন চিকিৎসক বিভিন্ন হাসপাতালে যুক্ত আছেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৮৮ হাজার ৯০০ চিকিৎসক প্রয়োজন। বিপরীতে আছেন ৩০ হাজার ৩১১ জন। ঘাটতি প্রায় ৫৮ হাজার ৫৮৯ জনের। অনুমোদিত পদ খালি পড়ে আছে সাড়ে ১১ হাজার।

অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিগগিরই পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে সংকট সমাধানে অস্থায়ীভাবে সংযুক্তির সংখ্যা বাড়িয়ে সংকট কাটানোর চিন্তা করছে সরকার। অধিদপ্তর এ হার ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে অনুমোদিত ওএসডির পদ ১০ শতাংশ। যেহেতু পদ অনুযায়ী চিকিৎসক নেই, কাজেই মাত্র ১০ শতাংশ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। এ জন্য ওএসডির সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার।’

সংযুক্তির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘একটা স্পেশালাইজড সাবজেক্টে একজন ডিগ্রিধারীকে এমন জায়গায় দিতে চাচ্ছি যেখানে পদ নাই, কিন্তু তাকে দিলে মানুষ ভালো সেবা পাবে। তখন তাকে ওএসডি করে অ্যাটাচমেন্ট (সংযুক্তি) হিসেবে ওখানে দিতে হয়। আবার অনেকে কোর্সে ঢুকেছে কিন্তু তাদের ট্রেনিং পোস্ট নাই, অ্যাটাচমেন্ট ছাড়া ট্রেনিং করতে পারছে না। তাই আমরা চাচ্ছি ওএসডির হার ১০ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত করতে। তাতে ডিগ্রিধারী চিকিৎসক যেমন তৈরি হবে, তেমনি জনগণও সেবা পাবে।’

পদায়ন নিয়ে যা ভাবছে সরকার

প্রশাসনিক ওএসডির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘বসিয়ে রেখে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করার কোনো যৌক্তিতা নেই। ওএসডি হওয়া চিকিৎসকদের মূলধারায় ফেরাতে সরকার আন্তরিক।’

তিনি বলেন, ‘ওএসডির সংখ্যাটা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সবচেয়ে বেশি হয়েছে। একজন চিকিৎসক যে মতেরই হোন, তার পেছনে সরকার শুধু শুধু বসিয়ে রেখে অর্থ অপচয় করতে পারে না। যেসব পদে তারা ছিলেন সেগুলো এখন পূর্ণ। তাই, অন্যভাবে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সরকার তা ভাবছে।’

ডা. ইদ্রিস হায়দার বলেন, ‘নবীন কর্মকর্তা যাদের পদায়ন করা হয়েছে, তাদের সেই দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, এমনকি প্রশিক্ষণও নেই। ফিডার পদে কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলে যে কোনো কাজ করতে গিয়ে তারা দ্বিধায় ভোগেন। অথচ চলতি দায়িত্বে কোনো কর্মকর্তাকে পদায়নের শর্ত হলো, গ্রেডেশন লিস্টে তার নাম থাকতে হবে। কারণ, যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে অদক্ষদের পদায়ন করলে বিভাগ স্থবির হয়ে পড়ে। দেশের ক্ষতি হয়।’

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে চিকিৎসকদের পদায়ন না করে ওএসডি করে রাখা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের চর্চা প্রকট হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য খাতের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় এমন আচরণের সুযোগ থাকা উচিত নয়।’