মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া বন্ধ হলেও কাটেনি আতঙ্ক

ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকার দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলনের চতুর্থ দিনে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া বন্ধ হলেও কাটেনি জনমনে আতঙ্ক। মহাসড়কে যানচলাচল শুরু হলেও তেমন কোনো চাপ নেই। খোলেনি অনেক দোকানপাট। ঘর থেকেও সহজে বের হচ্ছে না বাসিন্দারা।
মিরপুর-১১ নম্বরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সোয়া ১০টা থেকে পোষাক শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরুর ঘটনা ঘটে। অপরদিকে বেলা ১১টার দিকে কালশীতে এক পুলিশ সদস্যকে একা পেয়ে মারধর করে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
শ্রমিক-পুলিশের টানা আড়াই ঘণ্টার ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার এক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের পিছু হটাতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে অল্প অল্প করে যান চলাচল শুরু এবং মিরপুর-১১ নম্বর ও পল্লবীর মেট্রো স্টেশন চালু হয়।

এদিকে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া থামলেও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। এখনও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। প্রস্তুত রয়েছে পুলিশের এপিসি ও জলকামান।
মিরপুরের ইটপাটকেল পড়ে থাকা রাস্তায় নেই সেই চিরচেনা ভিড়। ঢিলেঢালাভাবে চলছে যানবাহন। গণপরিবহন তেমন একটা নেই, বেশির ভাগই রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা। অপরদিকে মেট্রোরেল স্টেশনও প্রায় জনশূন্য। স্টেশনের স্টাফরা থাকলে তেমন কোনো যাত্রী নেই। কয়েক মিনিট পর পর দু-একজনকে মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে দেখা যায়।

মিরপুর-১১, পল্লবী ও কালশী এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, আন্দোলনের কারণে অনেক দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। আবার দুপুরের পর থেকে কোনো কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে।
কথা হয় শারমিন আক্তার নামের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক ছাত্রীর সঙ্গে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে সবার মাঝে ভয় কাজ করছে। যার কারণে সহজে এই এলাকায় কেউ আসতে চায় না।
শারমিন বলেন, আমিও আসতাম না। কিন্তু না এসে উপায় নেই। ঝুঁকি নিয়েই আসতে হয়েছে। কারণ বাসা আমার এই এলাকায়।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে মিরপুরের মেট্রোরেল স্টেশন ফাঁকা। ঈদের ছুটি ব্যতিত এমন ফাঁকা কখনো দেখিনি। অন্য সময় প্রতিযোগিতা করে টিকিট কাটতে হতো। এখন লাইনে থাকা তো দূরের কথা, কয়েকজন ব্যতিত স্টেশনে কেউ নেই।
মিরপুর-১১, পল্লবী ও কালশী এলাকার কয়েকজন বাসিন্দাদের সঙ্গে। তাদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। তারা জানান, মারামারি ও হানাহানির মধ্যে সহজে ঘর থেকেও বের হতে চান না কেউ। বের হলেও যথা সম্ভব ঝামেলাপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তারা।
তাদের একজন ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, কয়েক দিন ধরে শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে ব্যবসা শেষ। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে কোনোমতে জীবন নিয়ে বাসায় চলে আসছি।

তিনি বলেন, বেঁচে থাকলে ব্যবসা করা যাবে, দু-দিন আগে পরে। যদি বেঁচেই না থাকি, সুস্থই না থাকি, তাহলে ব্যবসা করব কীভাবে?
মিরপুর সড়কে চলা অছিম, প্রজাপতি, বসুমতি ও রাজধানী বাসের কয়েকজন চালকের সঙ্গে। তাদের মধ্যে একজন প্রজাপতি বাসের চালক সুমন মিয়া। তিনি এই সড়কে লাগাতার সংঘর্ষের কারণে বাস চালাতে না গিয়ে বাসাতেই রয়ে গেছেন। বাসা থেকে পল্লবীতে আসেন সড়কের হালচাল দেখতে।
সুমন মিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, কয়েক দিন ধরে লাগাতার শ্রমিক আন্দোলন চলছে। শ্রমিকরা যখন তখন হামলা ও ভাঙচুর চালায়। অধিকাংশ সময়ই মহাসড়কে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকে। তাই আজ গাড়ি নিয়ে বের হওয়া হয়নি।
কথা হয় কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সঙ্গে। তাদের একজন তানভীর আহমেদ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, কয়েক দিন ধরে ছেলেকে এই আন্দোলনের মধ্যে যে কীভাবে, কত ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছি, সেটা এক আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। যাওয়ার সময় মনে হয়- এই কিছু হয়ে গেল।
আন্দোলনের সময় মিরপুর-১১ এলাকায় ডিউটি ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক মতিউর রহমান। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক। শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ করার চেষ্টা করলে আমরা তাদের সরিয়ে দিয়েছি।
ডিএমপির পিওএম (POM) দক্ষিণ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) তৌহিদুল আরিফ বলেন, পরিস্থিতি এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেছে। এতে কতজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন, তা আমি এই মুহূর্তে সরাসরি বলতে পারছি না। কারণ আমি এখনো মাঠে রয়েছি। আহত ও গ্রেপ্তারের সঠিক সংখ্যা পরে জানা যাবে।
তৌহিদুল আরও বলেন, সড়কের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা বিভিন্ন অলিগলিতে টহল দিচ্ছি। সেখানে কেউ অবস্থান করছে কি না, তা দেখা হচ্ছে। আজ সকালে এই এলাকায় এক পুলিশ সদস্যকে লাঠিপেটা করার একটি ভিডিও আমরা দেখেছি। ভিডিওটি ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার করার দাবিতে গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) মিরপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রথমে কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অসন্তোষ রোববার প্রকাশ্যে রূপ নেয়। এদিন শ্রমিকদের বিক্ষোভ এবং সড়ক অবরোধ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, হামলার কারণে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরে রোববার (১ নভেম্বর) আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামে এবং গাড়িতে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়, কঠোর অবস্থানের কারণে আন্দোলনকারীরা চলে যেতে বাধ্য হয়। সোমবারও (২ নভেম্বর) মিরপুরের পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত।


