logo
পিবিআইর চার্জশিট

টাকার লোভ সামলাতে পারিনি: ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ

টাকার লোভ সামলাতে পারিনি: ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ
আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহম্মেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফরের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘সমন্বয়ক’ পরিচয় দেওয়া আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে চাদা দাবি, গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা আদায় এবং সেই অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়ার তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

এ ঘটনায় আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন দুই আসামি। তাদের একজন আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ নিজের জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, টাকার লোভ সামলাতে না পেরে চাঁদা চেয়েছিলেন তিনি।

পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন। ওই পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তারা নিয়মিতভাবে থানায় যাতায়াত করতেন ও বিভিন্ন মামলার আসামি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও তাদের অবস্থান সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রদানের লক্ষ্যে সহযোগিতায় পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। পরে মামলার আসামিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন লোকজনকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী বা সমর্থক আখ্যা দেন এবং তাদের মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি ও চাঁদা গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়। ওই কার্যক্রমের মাধ্যমে আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে থাকে।

অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ মুন্সী উল্লেখ করেছেন, তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ এবং জানে আলম অপুর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮ ও ৩৮৫ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মামলাটি ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গুলশান থানায় করেন সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫)। তিনি গুলশান-২ এর ৮৩ নম্বর সড়কের একটি বাসায় থাকেন। মামলার তদন্ত নথি অনুযায়ী, তার স্ত্রী সাবেক এমপি শাম্মী আহম্মেদ। প্রথমে মামলাটি তদন্ত করেন গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোখলেছুর রহমান। পরে তদন্তের দায়িত্ব নেয় পিবিআই। সংস্থাটির এসআই ফিরোজ আহম্মেদ মুন্সী তদন্ত শেষে গত ১৫ অক্টোবর ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন।

তিনি বলেন, আসামিদের একজন শিশু হওয়াই তার বিচার হবে শিশু আদালতে। ১০ নভেম্বর এই মামলার পরবর্তী দিন ধার্য আছে। ওই দিন অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি হবে। মামলার ছয় আসামিই এখন জামিনে। তবে সর্বশেষ ১ নভেম্বর পর্যন্ত থানার জিআরে (সাধারণ নিবন্ধ শাখা) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযোগপত্রটি এখনো আদালতে জমা হয়নি।

পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই রাতে শাম্মী আহম্মেদ গুলশানের বাসায় অবস্থান করছেন, এমন খবর পেয়ে কয়েকজন নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে গুলশান-২ গোলচত্বরে জড়ো হন। পরে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু রাত আনুমানিক ২টার দিকে গুলশান থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান ও তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানোর ব্যবস্থা করতে বলেন পুলিশকে। থানা-পুলিশ বিষয়টি গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে জানায়। পরে পুলিশ ও কথিত সমন্বয়কদের একটি দল বাসায় যায়। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনার বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ১৭ জুলাই ভোরে গুলশান থানার এসআই আরমান আলীর নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশের সদস্য এবং আবদুর রাজ্জাক, জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন, আমিনুল ইসলামসহ আরও ১০ থেকে ১২ জন ওই বাসায় যান। তারা নিজেদের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কক্ষে সাবেক এমপিকে খোঁজেন।

শাম্মী আহম্মেদকে না পেয়ে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তল্লাশির একটি তালিকা তৈরি করে সবাই বাসা থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু পুলিশ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আবার বাসাটিতে যান।

পিবিআইয়ের তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, তারা বাদীকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখান। গ্রেপ্তার এড়াতে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। ভয়ভীতির মুখে বাদী টাকা দিতে রাজি হন। তাৎক্ষণিকভাবে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পর আসামিরা বাকি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে বলে চলে যান। টাকা নেওয়ার ভিডিও ফুটেজও তদন্তকারীরা পেয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আবার ওই বাসায় যান। ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করলেও কেউ দরজা না খোলায় তারা চলে যান। পিবিআই জানায়, পরে পাওয়া কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনা করে ওই সময় তাদের ঘটনাস্থলে থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পিবিআইয়ের তদন্ত নথি অনুযায়ী, ২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের জন্য আবার ওই বাসার সামনে যান আসামিরা। তখন বাদী বাসায় ছিলেন না। বাসার নিরাপত্তাকর্মী মো. হান্নান ফোনে তাকে বিষয়টি জানান। বাদী সঙ্গে সঙ্গে গুলশান থানায় খবর দেন। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও কিশোর আমিনুল ইসলামকে আটক করে। জানে আলম অপু পালিয়ে যান। পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহায়তায় তাকেও গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তদন্ত নথিতে তাদের দুজনের জবানবন্দিতে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার প্রধান আসামি আবদুর রাজ্জাক রিয়াদের আইনজীবী আকরাম হোসাইন বলেন, তারা এখনো অভিযোগপত্র দেখেননি। রিয়াদের পক্ষে আদালতে পিটিশন করবেন।

বাদী সিদ্দিক আবু জাফরের আইনজীবী জহুরুল আলম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়ায় তারা সন্তুষ্ট। তারা ন্যায়বিচার চান।

অন্যদিকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী পরিচয় দেওয়া আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ এই চাঁদাবাজির হোতা। তাকে ওই সময়ে আদালত একাধিকবার রিমান্ডে পাঠিয়েছিলেন। চাঁদাবাজির মামলায় প্রত্যেক আসামিকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী বিচার হলে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হবে।