Advertisement

জামালপুরে ছয় প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি, প্রশ্নের মুখে পাঠদান

এশিয়া পোস্ট নিউজ, জামালপুর
জামালপুরে ছয় প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি, প্রশ্নের মুখে পাঠদান
জামালপুরের ইসলামপুরের একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন শিক্ষক। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ভেবেছিলাম পরীক্ষা আগের মতোই হবে। কিন্তু হলে ঢুকেই দেখি সিসি ক্যামেরা। গার্ডও অনেক কড়া ছিল, একটু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখারও সুযোগ পাইনি। এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কথাগুলো বলছিল জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার এক পরীক্ষার্থী।

Advertisement

একই ধরনের অজুহাত শোনা গেছে আরও কয়েকজন অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর মুখে। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, পরীক্ষার হলে সিসি ক্যামেরা বা কড়াকড়ি নজরদারি মূল কারণ নয়; বরং এই ফল বিপর্যয় জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের চরম দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ সংকটকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে।

এবারের মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় জামালপুর জেলার ৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। ফলাফলের এই শূন্যের কোঠায় নেমে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই স্থানীয় শিক্ষা অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ইসলামপুর উপজেলার কদমতলী ক্বারীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও বীর মাইজবাড়ী দাখিল মাদ্রাসা; সরিষাবাড়ী উপজেলার ছাপারকোনা মনিজা আবুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়; বকশীগঞ্জ উপজেলার শেফালী মফিজ মহিলা মাদ্রাসা এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার দেওয়ানগঞ্জ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ ও সানন্দবাড়ী টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট।

ফল বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ইসলামপুর উপজেলার কদমতলী ক্বারীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ৮ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও ৬ জন প্রক্সি শিক্ষকসহ মোট ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। অথচ এ বছর সেখান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থী। ফলাফলের পর দেখা যায়, তাদের ৩ জনই অকৃতকার্য হয়েছে। ১৪ জন শিক্ষকের সমন্বিত প্রচেষ্টার পর কীভাবে শতভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করে, তা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে।

ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থী রাসেল বলেন, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, তবুও ফেল। এবার কেন্দ্রে কোনো সুযোগ সুবিধা ছিল না, সিসি ক্যামেরা ছিল। তাই ভালোমতো ঘাড় ঘুরানোর সুযোগ পাই নাই।

একই প্রতিষ্ঠানের গণিতে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থী হৃদয় বলে, আমাদের কেন্দ্র ছিল গোয়ালচর হাই স্কুল। ভেবেছিলাম আগের মতোই পরীক্ষা দেওয়া যাবে। কিন্তু হলে ঢুকে দেখি সিসি ক্যামেরা। গণিতে ফেল করেছি, তবে কেন করেছি বুঝতে পারছি না। আমরা খাতা পুনর্নিরীক্ষার (বোর্ড চ্যালেঞ্জ) আবেদন করব।

তবে শিক্ষার্থীরা সিসি ক্যামেরার অজুহাত দিলেও অভিভাবকেরা কাঠগড়ায় তুলছেন শিক্ষকদের। সুমন মিয়া নামের এক অভিভাবক বলেন, স্কুলে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পাঠ পায় না। শতভাগ ফেলের দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপালে হবে না। শিক্ষকেরা নিয়মিত ক্লাসে আসেন না, পড়াশোনাও করান না।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এমন অভিযোগ মেনে নিতে নারাজ শিক্ষকেরা। কদমতলী ক্বারীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ছাইফুল্লাহ বলেন, আমাদের ৩ জন ছাত্রেরই পাস করার কথা ছিল। দুর্ভাগ্যবশত অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ঘটে গেছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন না হয়, সেজন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী বছর থেকে আমরা প্রতিদিন অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা করে স্পেশাল ক্লাস নেব।

সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. হারুন অর রশিদ মনে করেন, এবারের পরীক্ষার ফল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।

তিনি বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে কড়াকড়ি হওয়ায় আসল সত্যটা সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা শিথিল মূল্যায়ন পদ্ধতি, করোনাকালীন শিক্ষার ঘাটতি এবং ধারাবাহিক দুর্বল প্রস্তুতির ফল এখন দেখা যাচ্ছে। এই বিপর্যয় এক দিনে তৈরি হয়নি।

সাবেক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় এবং কিছু ক্ষেত্রে মাদকের বিস্তার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি তিনি এনটিআরসিএ চালুর আগের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দায়ী করে বলেন, পুরোনো অনেক শিক্ষকের আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি ও বর্তমান কারিকুলামের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, যা শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলছে।

শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে শিক্ষা প্রশাসন।

ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ মো. জুবায়ের এশিয়া পোস্টকে জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।

জামালপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামছুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৩ জন পরীক্ষা দেয় কীভাবে! নীতিগতভাবে তো এই স্কুলের এমপিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। ৩ জন পরীক্ষা দিয়ে ৩ জনই ফেল করার ঘটনায় আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাব। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর জামালপুর জেলা থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৩১ হাজার ৬৩৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৫ জন শিক্ষার্থী। আর ৬টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেলের ঘটনায় জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার তদারকি ও পাঠদানের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

বিষয় :