২০ বছরের আইনি জটিলতা পেরিয়ে নকলায় হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন

শেরপুরের নকলায় প্রায় দুই দশক ধরে আটকে থাকা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন নির্মাণের জটিলতা শেষ। জমি নিয়ে মামলার কারণে ২০১২ সালে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণকাজ।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর চলতি বছরের গত ১৬ আগস্ট সরকারের পক্ষে আদালতের রায় আসায় ফের আশার আলো দেখছেন নকলাবাসী। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে স্টেশনটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ।
৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত শেরপুরের নকলা উপজেলা। এ উপজেলায় বসবাস করেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। জনবহুল এই উপজেলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু আগুন নেভানোর জন্য নিজস্ব কোনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নেই। ফলে কোথাও আগুন লাগলে পাশের উপজেলা কিংবা জেলা সদর থেকে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসার অপেক্ষায় থাকতে হয়।
এর মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বসতঘর, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। বাড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। অথচ নকলায় একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল প্রায় ২০ বছর আগে। ভবনের বড় একটি অংশ নির্মাণও হয়েছিল। কিন্তু জমির মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতায় থেমে যায় পুরো প্রকল্প।
জানা গেছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা সদরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন স্থাপনের প্রকল্পের আওতায় ২০০৬ সালে নকলায় স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য নকলা পৌর এলাকায় ঢাকা-শেরপুর মহাসড়কের পাশে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তৎকালীন হিসাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ টাকা। তবে, অধিগ্রহণ করা জমিটি নিজেদের নামে রেকর্ডভুক্ত দাবি করে নির্মাণকাজে বাধা দেন নকলার দুই ভাই কেশব প্রসাদ ও দুধনাথ প্রসাদ।
পরে স্থানীয় নেতারা ও প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্মাণকাজ ফের শুরু হলেও অধিগ্রহণের অর্থ গ্রহণ না করে ২০০৬ সালেই আদালতে মামলা করেন তারা। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১২ সালে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ আসে। এতে প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরই থেমে যায় স্টেশনটির নির্মাণকাজ।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় নকলা উপজেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ভবনটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। ভবনের বিভিন্ন অংশে জমেছে ধুলা-ময়লা, কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে জরাজীর্ণতার ছাপ। ভবনের চারপাশে গজিয়েছে আগাছা-লতাপাতা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ায় পুরো স্থাপনাটি অনেকটা পরিত্যক্ত ভবনের মতোই দেখাচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে প্রথমেই খবর দেওয়া হয় পাশের উপজেলা কিংবা জেলা সদরের ফায়ার সার্ভিসকে। কিন্তু দূরত্বের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই পুড়ে যায় ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ফলে দীর্ঘদিন ধরে একটি নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা কুরবান আলী বলেন, আমগো নকলায় আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস আইতে আইতে অনেক দেরি হইয়া যায়। ততক্ষণে আগুন এক ঘর থেইকা আরেক ঘরে, দোকান থেইকা আরেক দোকানে ছড়াইয়া পড়ে। কত মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট পুইড়া ছাই হইছে। তাও ফায়ার সার্ভিসটা চালু হয়তাছে না। এইডা চালু হইলে আমগর যে কী উপকার হবে তা বলার মতো না।
বাসিন্দা শহিদ মিয়া বলেন, এই ভবনটা কত বছর ধইরা এইভাবেই পইড়া আছে, আমরা নিজের চোখে দেহতাছি। ফায়ার সার্ভিস বানাইবো বইলা কাজ শুরু হইছিল, পরে মামলা-মোকদ্দমায় সব বন্ধ হইয়া গেল। আগুন লাগলে আমগো অনেক ভয় লাগে। গাড়ি আইতে আইতে আগুন সব শেষ কইরা ফালায়।
আরেক বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, আগুন তো আর কইয়া-কইয়া আসে না, হঠাৎ কইরাই লাগে। তখন ফায়ার সার্ভিস কাছে থাকলে তাড়াতাড়ি আইয়া আগুন থামাইতে পারে। কিন্তু নকলায় তো ফায়ার সার্ভিসই নাই। পাশের জায়গা থেইকা গাড়ি আইতে আইতে আগুন অনেক দূর ছড়াইয়া যায়। গরিব মানুষের ঘর পুইড়া গেলে আবার নতুন কইরা ঘর তোলা কত কষ্টের।
তবে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চলতি বছরের আগস্ট মাসের ১৬ তারিখে সরকারের পক্ষে আদালতের রায় এসেছে। ফলে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার অবসান হয়েছে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. জানে আলম এশিয়া পোস্টকে জানান, নকলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে জমি-সংক্রান্ত আইনি জটিলতার কারণে বন্ধ ছিল। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আদালতে মামলা চলেছে। ফলে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, গত ১৬ আগস্ট সরকারের পক্ষে আদালতের রায় হওয়ায় দীর্ঘদিনের সেই আইনি জটিলতার অবসান হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কাজ শেষ হলে পরে তা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। আমরা আশা করছি, দ্রুতই বাকি কাজ শেষ করে নকলাবাসীকে ফায়ার সার্ভিসের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।





