logo

সুনামগঞ্জে সংঘর্ষে মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে ২৩ বাড়ি ভাঙচুর-লুট

সুনামগঞ্জে সংঘর্ষে মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে ২৩ বাড়ি ভাঙচুর-লুট
ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের দুর্বাকান্দা গ্রামে গত ৫ নভেম্বর পূর্ববিরোধের জেরে দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

কিন্তু পরদিন শুক্রবার ৬ নভেম্বর সকালে আহত একজন মারা গেছে, এমন গুজব ছড়িয়ে প্রতিপক্ষের অন্তত ২৩টি বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করার অভিযোগ উঠেছে।

আরও অভিযোগ উঠেছে, দুর্বাকান্দা গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় ইউপি সদস্য সাইদুল হক ও তার ভাই শামসুল আলম প্রতিপক্ষের সোহেল মিয়ার পক্ষের লোকজনের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করেছেন।

প্রতিপক্ষের বাড়িঘর ভাঙচুর হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে অভিযুক্ত শামসুল আলম বলেছেন, মৃত্যুর গুজবে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। অনেক চেষ্টা করেও উত্তেজিত লোকজনকে আটকানো সম্ভব হয়নি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে রাতের আঁধারে নৌকা দিয়ে যাওয়ার সময় দুর্বাকান্দা গ্রামের ইউপি সদস্য সাইদুল হকের চোখে টর্চের আলো ফেলেছিলেন গ্রামের সোহেল মিয়া। তখন ইউপি সদস্য সাইদুল হক সোহেল মিয়াকে গালিগালাজ করেছিল। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। কয়েক দিন আগে কিছু কাগজপত্র দেখানোর নাম করে ডেকে নিয়ে ইউপি সদস্যকে মারপিট করেন সোহেল মিয়ার লোকজন। এ ঘটনার জেরে ৫ নভেম্বর সকালে ইউপি সদস্য সাইদুল হক ও সোহেল মিয়ার লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়। উভয় পক্ষের আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

পরে শুক্রবার সকালে ইউপি সদস্য সাইদুল হকের পক্ষের সাজু মিয়া (৬০) নামের একজন মারা গেছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে প্রতিপক্ষের অন্তত ২৩টি বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করে ইউপি সদস্য সাইদুল হক ও তার ভাই শামসুল আলমের লোকজন। লুটপাট ও ভাঙচুরের পর বাড়ি-ঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুতের মিটার পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাঙাচোরা আসবাব, গৃহস্থালি জিনিসপত্রের মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির নারী ও শিশুরা।

দুর্বাকান্দা গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছে, প্রতিপক্ষের পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও লুটপাটের জিনিসপত্র নিতে এসেছিল। পুরুষরা ভাঙচুর করেছে আর মহিলারা ব্যাগে ভরে মালপত্র নিয়ে গেছে।’

লায়েছ মিয়ার স্ত্রী ছালেমা বেগম বলেন, রাজন মিয়া, পালিশ মিয়া, সামছুল মিয়া গ্রামের তাদের পক্ষের মানুষ নিয়ে ধান-চাল, টাকা-পয়সা, হাঁস-মুরগি, হাঁড়ি-পাতিলসহ ঘরের কোনো জিনিস নিতে বাকি রাখেনি। সব জিনিসপত্র নিয়া গেছে।

জমিরুন নেছা, শিরিনা বেগমসহ বেশ কয়েকজন নারীর অভিযোগ করে জানান, বৃহস্পতিবারের মারামারিকে কেন্দ্র করে শুক্রবার সকালে শামসুল মিয়ার নির্দেশে পালিশ মিয়া, রাজন মিয়াসহ ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষ বাড়ি-ঘরে হামলা করে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। সবার স্বর্ণালংকার, টাকাপয়সা ও দামি জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছে। পানি খাওয়ার কলস, হাঁড়ি-পাতিল, ধান-চালসহ সবকিছু নিয়ে গেছে, বস্তার রাখা সারা বছরের মজুতের চাল ও জিনিসপত্র নষ্ট করে দিয়ে গেছে। ঘরের বেড়া, চালসহ সবকিছুই ভাঙচুর করে কারেন্টের মিটারও ভেঙে চুরমার করে শেষ করে দিয়েছে।

এ অভিযোগ বিষয়ে অভিযুক্ত পালিশ মিয়া বলেন, বৃহস্পতিবারের ঘটনায় আমি জড়িত ছিলাম না, আমি ঢাকায় ছিলাম। শুক্রবার সকালে বাড়িতে এসে ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ শুনি আবার গ্রামে মারামারি লাগছে। আমি বাড়িঘর ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত নই।

ইউপি সদস্য সাইদুল হকের ভাই অভিযুক্ত শামসুল আলম বলেন, শুক্রবার সকালের আমরা সবাই সমবেত হয়েছিলাম। এমন সময় হঠাৎ খবর রটে যে আহত একজন মারা গেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ উত্তেজিত হয়ে এসব কাজ করেছে, যা উচিত হয়নি। আমরা চেষ্টা করেছি কিন্তু সবাইকে আটকানো সম্ভব হয়নি এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আশা করি আর কিছু হবে না।

শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অলিউল্লাহ বলেন, দুর্বাকান্দা গ্রামে সংঘর্ষের পরের দিন কিছু ঘর-বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এখনও কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব। তবে গ্রামের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।

সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের লোজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এলাকাটি দুর্গম, থানা অনেক দূরে, সরাসরি যাওয়া যায় না। গ্রামের কিছু বাড়ি-ঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে, খবর পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।