logo

মানিকগঞ্জ/অতিরিক্ত সারেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ফলন, কমছে মাটির উর্বরতা

অভি হাসান
মানিকগঞ্জ
অতিরিক্ত সারেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ফলন, কমছে মাটির উর্বরতা
ধানের ফলন বাড়ানোর আশায় জমিতে সার প্রয়োগ করছেন কৃষক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ফসলের বেশি ফলন পাওয়ার আশায় দীর্ঘদিন ধরে জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন মানিকগঞ্জের কৃষকরা। সঠিক মাত্রা না জেনে অতিরিক্ত সার প্রয়োগে মাটির উর্বরতা শক্তি আশঙ্কাজনক হারে কমে পাচ্ছে। অন্যদিকে, জৈবসারের ব্যবহার কমে যাওয়ায় মাটির স্বাস্থ্য নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের উদ্বেগ। এ সুযোগে মাঠপর্যায়ে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দামে সার বিক্রি এবং নিম্নমানের সার সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে ডিলারের বিরুদ্ধে।

বর্তমানে জেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই আমন ধানের আবাদ এবং আগাম সবজি চাষের প্রস্তুতি চলছে। এসব ফসলে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের চাহিদা রয়েছে।

জেলার ১০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও নির্ধারিত মাত্রায় সার প্রয়োগ করেই কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যেত। এখন একই পরিমাণ সার ব্যবহার করেও আগের মতো ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ফলন বাড়ানোর আশায় এবং সঠিক মাত্রা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে কেউ কেউ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগ করছেন।

কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের গাজীপাড়া এলাকার কৃষক মিশুক গাজী বলেন, ছয় বছর আগে ৫০০ শতাংশ জমিতে যেখানে প্রায় ১০ মণ সার লাগত, এখন একই জমিতে প্রায় ১২ মণ সার প্রয়োজন হচ্ছে। একই জমিতে বারবার ফসল চাষের কারণে সারের প্রয়োজন বাড়ছে।

একই এলাকার কৃষক সাগর গাজী মনে করেন, আগাম সবজি চাষে সারের প্রয়োজন বেশি হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঘন ঘন বৃষ্টিতে জমিতে দেওয়া সার ধুয়ে যায়। ফলে একবার সার প্রয়োগ করলেই হয় না, কয়েক দফায় সার দিতে হয়।

আটিগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক মনির হোসেন বলেন, গত কয়েক বছরে এলাকায় সবজি চাষ অনেক বেড়েছে। আগে হাতে গোনা দু-একজন সবজি চাষ করলেও এখন শত শত কৃষক এদিকে ঝুঁকেছেন। ধানের পরিবর্তে অনেকে সবজি চাষ করছেন। সবজিতে নিয়মিত সার প্রয়োজন হওয়ায় সারের চাহিদাও বেড়েছে। সুযোগ পেলে কেউ কেউ পরবর্তী প্রয়োজনের কথা ভেবে কিছুটা বেশি সার কিনে রাখার চেষ্টা করেন।

কমছে জৈব পদার্থ

আটিগ্রাম ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জেসমিন জেরিন বলেন, জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ যেখানে ৫ থেকে ৭ শতাংশ থাকার কথা, সেখানে অনেক জমিতে তা ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। জৈবসার ব্যবহার কমে যাওয়ায় মাটির উর্বরতা কমছে। ফলে কৃষকেরা বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন এবং এর চাহিদাও বাড়ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি মাটির গুণাগুণও নষ্ট হচ্ছে।

জমিতে প্রয়োগ করতে সার প্রস্তুত করছেন এক কৃষক। ছবি: এশিয়া পোস্ট
জমিতে প্রয়োগ করতে সার প্রস্তুত করছেন এক কৃষক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একই এলাকার দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুকদেব ভৌমিক বলেন, দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ব্যবহারের পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহার না করায় মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। কৃষকদের জৈবসার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকেই তা নিয়মিত অনুসরণ করছেন না।

কৃষি গবেষক বিল্লাল হোসেন বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির উপকারী অণুজীব দিন দিন কমে যাচ্ছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈবসার ব্যবহারে জোর দিতে হবে।

বাড়তি দাম ও নিম্নমানের সার

কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দামে সার বিক্রি এবং নিম্নমানের সারের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কৃষক। তাদের অভিযোগ, চাহিদার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো পরিবেশক নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন ও আগাম সবজি মৌসুমে মানিকগঞ্জে ইউরিয়া ১৫ হাজার ৯১৭ মেট্রিক টন, টিএসপি ৫ হাজার ৪৭০ মেট্রিক টন, ডিএপি ১২ হাজার ২০১ মেট্রিক টন এবং এমওপি ৭ হাজার ২০২ মেট্রিক টন বরাদ্দ রয়েছে। কৃষি বিভাগের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার বরাদ্দ বেশি এবং তা পর্যাপ্ত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর উপজেলার এক কৃষক বলেন, আমরা অনেক সময় অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য হই। কিন্তু বিক্রেতার নাম প্রকাশ বা অভিযোগ করলে পরে প্রয়োজন থাকলেও তারা আমাদের কাছে সার বিক্রি করতে চান না।

তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে আগাম সার কিনে রাখার প্রবণতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কাটিগ্রাম বাজারের সার বিক্রেতা মো. শরিফুল ইসলাম। তার দাবি, কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীদের পরামর্শ অনুযায়ী কৃষকদের প্রয়োজন বিবেচনায় সার সরবরাহ করা হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাজাহান সিরাজ বলেন, জেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। সার বিতরণে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের সার নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।