‘জুলাই যোদ্ধা’ সেজে সরকারি টাকায় যুবকের বিদেশে চিকিৎসা, বাবা বললেন—লজ্জা দিয়েন না

মাদারীপুরের কালকিনিতে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত হন এক যুবক। পরে তাকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে সরকারি অর্থে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এতে তার পেছনে সরকারের প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম মো. রায়হান। তার বাড়ি মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলা ঠেঙ্গামারা এলাকায়।
স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ঠেঙ্গামারা এলাকায় সংঘর্ষের সময় রায়হান আহত হন। পরে তাকে ৫ আগস্টের আন্দোলনে আহত হিসেবে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা অভিযোগ করেন, বিদেশে তার চিকিৎসায় সরকারের প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
এ বিষয়ে রোববার (২৩ আগস্ট) সরেজমিনে গেলে স্থানীয়রা জানান, রায়হান বেশির ভাগ সময় নেশাগ্রস্ত থাকতেন। ৮ আগস্ট কালকিনি বাজারে আধিপত্য বিস্তার ও নেশার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। ৮ আগস্ট দিনভর এ বিষয় নিয়ে মারামারি হয়। এমনকি রায়হান এলাকায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর কারণে এলাকায় তিনি ‘বোমা রায়হান’ নামেও পরিচিত। নিজের হাতে থাকা বোমা বিস্ফোরিত হয়ে রায়হান আহত হন বলে জানান তারা।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, জুলাই আন্দোলনে রায়হান কখনোই অংশ নেননি। আন্দোলন ৫ তারিখে শেষ আর তিনি আহত হয়েছেন ৮ আগস্ট। তিনি ভুয়া জুলাই যোদ্ধা সেজেছেন। কিন্তু কাগজে-কলমে তিনি একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে সরকারি সুবিধা নিয়ে চিকিৎসাও করিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা কাদের হোসেন, আলমগীর হাওলাদার, হাকিম মুন্সি, রেজাউল করিম, সবুজ মিয়া, রেদোয়ান মিরা জানান, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট কালকিনির ঠেঙ্গামারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই সময় রায়হানের হাতে থাকা বোমা বিস্ফোরিত হয়ে সে আহত হয়। ৮ আগস্টেই রায়হানের আহত হওয়ার প্রকৃত কারণ। পরে তাকে জুলাই আন্দোলনের আহত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসার নথি ঘিরে প্রশ্ন
৫ আগস্টের ঘটনায় আহত হয়ে থাকলে চার দিন পর ৮ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণ কী? এমন প্রশ্নে ঠেঙ্গামারা ও আশপাশের বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, রায়হান কীভাবে এবং কোথায় আহত হয়েছে, এ বিষয়ে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আগে যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার ছিল। আহত হওয়ার স্থান, সময় ও ঘটনার সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। রায়হান আহত হয়েছে কালকিনিতে ৮ তারিখে, তাহলে জুলাই যোদ্ধা হয় কীভাবে? এর সঙ্গে যারা জড়িত, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা দাবি জানাই।
কালকিনি বাজারের মুদি দোকানদার সেলিম আকন বলেন, ‘আমরা ৮ আগস্টের সংঘর্ষের কথা জানি। ওই ঘটনার সময়ই রায়হান আহত হয়েছে, এমনটাই এলাকায় আলোচনা ছিল। এখন তাকে জুলাই আন্দোলনের আহত বলা হলে বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার।
কালকিনি বাজারের অপর দোকানদার রাজু হাওলাদার বলেন, ‘সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু প্রকৃত আহত ব্যক্তি যেন সুবিধা পান, আর ভুল তথ্য দিয়ে কেউ সুবিধা নিলে সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার।
থাইল্যান্ডে চিকিৎসা, ব্যয় ৮০ লাখ
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রায়হান ‘খ’ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এই পরিচয়ে তিনি সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে থাইল্যান্ডেও পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় চার মাস চিকিৎসা নিতে তার পেছনে সরকারের প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ আরও দাবি করেছেন, তিনি এখন নিয়মিত সরকারি ভাতাও পাচ্ছেন।
রায়হানের পরিবারের দাবি, তিনি ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকপাড় এলাকায় পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হন।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে রায়হানের বাবা বাদশা হাওলাদার বলেন, আমাদের ভুল হয়ে গেছে। এটা নিয়ে এত কিছু হবে বুঝতে পারিনি। আমাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করে লজ্জা দিয়েন না।
রায়হান সরকারি ৮০ লাখ টাকায় থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিয়েছেন কি নাম, জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন।
অভিযোগ বিষয়ে জানার জন্য রায়হানের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি। এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে এই প্রতিবেদনে তথ্য হালনাগাদ করা হবে।
মাদারীপুর জেলা এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, এটা তদন্ত করেছে গোয়েন্দা সংস্থার লোক। এমনকি যে যেই হসপিটালে ভর্তি ছিল, সেই হসপিটাল থেকে তথ্য দিয়েছে। এ বিষয়ে আমার মূল কথা হলো, যেহেতু রায়হান একজন ভুয়া জুলাই যোদ্ধা, তার বিচার হওয়া দরকার।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ও যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব শরিফুল আবেদীন কমল বলেন, রায়হানকে জুলাই আন্দোলনে আহত হিসেবে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে আমাদের কাছে যে নথি এসেছে, সেটির ভিত্তিতেই কাজ করেছি। ঢাকা থেকে এটা অনলাইনে আপলোড হয়েছে। আমরা শুধু এখান থেকে স্বাক্ষর করে দিয়েছি।




-9519c0.jpg)