logo

সুন্দরবনে বাড়ছে পর্যটক, ৮০ শতাংশের প্রথম পছন্দ করমজল কেন

শেখ সোহেল
বাগেরহাট
সুন্দরবনে বাড়ছে পর্যটক, ৮০ শতাংশের প্রথম পছন্দ করমজল কেন
সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র ছবি: এশিয়া পোস্ট

নদী-খালের জোয়ার-ভাটা, ঘন সবুজের বিস্তীর্ণ বনভূমি আর বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ—প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য আধার সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের এই বনকে ঘিরে পর্যটকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। সুন্দরবনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ, বন্যপ্রাণীর দেখা পাওয়া এবং নদীপথে বনের গভীরে প্রবেশের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিতে প্রতি বছরই দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।

সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের চারটি রেঞ্জে হারবাড়িয়া, আন্ধারমানিক, আলীবান্ধা, কলাগাছিয়া, কালবিগী, শেখেরটেক, কটকা-কচিখালী, টাইগার পয়েন্ট, জামতলা সি-বিচ, সুপতি, ত্রিকোণ আইল্যান্ড, দুবলারচর, চাঁদপাই, হিরণ পয়েন্ট, দোবেকী, মান্দারবাড়িয়া ও নীলকমলসহ বেশ কিছু আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা রয়েছে। এসব স্থান থাকার পরও সহজ যোগাযোগ ও স্বল্প সময়ে ঘুরে আসার সুযোগের কারণে পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করমজল।

পর্যটকদের প্রথম পছন্দ করমজল কেন

২০০০ সালে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রটি লোকালয় থেকে মাত্র ২০ মিনিটের নৌপথের দূরত্বে। বাগেরহাটের মোংলা পৌরসভার অপর পাড়ে পশুর নদী পার হলেই করমজলে পৌঁছানো যায়। সুন্দরবনের সবচেয়ে কাছের এই পর্যটনকেন্দ্রটি রাজধানী ঢাকা থেকেও তুলনামূলক কম সময়ে যাওয়া যায়। দিনে এসে সুন্দরবন ঘুরে একই দিনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকায় প্রতিদিনই শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে ছুটে আসেন।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত পর্যটন মৌসুমে সুন্দরবনে আড়াই লাখের বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যটকই ঘুরে দেখেছেন চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র।

করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে রয়েছে ২৮টি চিত্রা ও মায়াবি হরিণ। দুটি পুকুর ও দুটি শেডে রয়েছে চারটি মিঠাপানির প্রজাতিসহ লবণপানির আরও ৭১টি ছোট-বড় কুমির। দুটি পুকুরে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ৪৯৭টি বাটাগুর বাসকা কচ্ছপ।

এ ছাড়া সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য রয়েছে কংক্রিটের উঁচু টাওয়ার, প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে উঁচু ফুটট্রেইল, ঝুলন্ত সেতু ও সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি ব্যাখ্যা কেন্দ্র। সেখানে বাঘ, হরিণ, কুমির ও তিমির হাড়সহ বিভিন্ন প্রাণীর দেহাবশেষ, চামড়া ও বাঘের কঙ্কাল প্রদর্শন করা হয়েছে।

ফুটট্রেইলে হাঁটার সময় সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, শৈবাল ও অর্কিড দেখার সুযোগ পান পর্যটকরা। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর বিচরণও বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।

ঢাকা থেকে করমজল ঘুরতে আসা পর্যটক রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনের কথা অনেক শুনেছি। এবার সরাসরি এসে এর সৌন্দর্য দেখার সুযোগ হয়েছে। নদীপথে বনের ভেতর যাওয়া, সবুজ গাছপালা, হরিণ ও কুমির দেখা—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা অসাধারণ। করমজলের পরিবেশও খুব ভালো লেগেছে।’

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

চট্টগ্রাম থেকে আসা সুমাইয়া রহমান বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে একদিনের জন্য সুন্দরবন ঘুরতে এসেছি। করমজলের ফুটট্রেইল, ঝুলন্ত সেতু ও বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ আমাদের খুব ভালো লেগেছে। সুন্দরবনের প্রকৃতি খুব কাছ থেকে দেখার এই অভিজ্ঞতা মনে রাখার মতো। সুযোগ পেলে আবারও এখানে আসতে চাই।’

পর্যটকের চাপ সামলাতে ব্যস্ত বন বিভাগ

পর্যটন মৌসুমে খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্যুর অপারেটররা জাহাজ ও লঞ্চের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সুন্দরবন ভ্রমণে নিয়ে আসেন। বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই এসব নৌযান সুন্দরবনে প্রবেশ করে।

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সেপ্টেম্বর থেকে টানা নয় মাস সুন্দরবনে পর্যটন মৌসুম থাকে। এ সময়ে খুলনা থেকে ট্যুর অপারেটররা অর্ধশতাধিক বিলাসবহুল ও আধুনিক জাহাজ-লঞ্চের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সুন্দরবন ভ্রমণে নিয়ে আসেন।’

তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনে সব সময় অতিরিক্ত মানুষের ভিড় থাকলে ম্যানগ্রোভ বনের প্রাণ-প্রকৃতির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য বন বিভাগ ইকোট্যুরিজমের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বনের ওপর চাপ কমাতে ইতোমধ্যে সুন্দরবনে সাতটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকসহ সব ধরনের বনজীবীর সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকে। সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমের ওপর তুলনামূলক কম চাপ পড়ে—এমন একটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র হলো করমজল। এ কারণে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রটি সারা বছর দেশি-বিদেশি ইকোট্যুরিস্টদের জন্য খোলা রাখা হয়।’

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

তিনি আরও বলেন, ‘গত পর্যটন মৌসুমে আড়াই লাখের বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশই করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে এসেছেন। সরকারি লম্বা ছুটি ছাড়াও শুক্র ও শনিবার করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে পর্যটকের চাপ সামাল দিতে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হয়। আমরা সব সময় পর্যটকদের সেবার পাশাপাশি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়ে থাকি।’

চলতি পর্যটন মৌসুমে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে না পড়লে সুন্দরবনে প্রায় তিন লাখ পর্যটকের আগমন ঘটতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন এই বন কর্মকর্তা।