মাটির হাঁড়ির মাংসের টানে মধুপুরের বনে

চুলায় জ্বলছে আগুন। তার ওপর সারি সারি মাটির হাঁড়ি। ঢাকনা খুলতেই ভেসে আসছে গরম মাংসের ঘ্রাণ। যেন গ্রামীণ কোনো পরিবারের রান্নার আয়োজন। কিন্তু দৃশ্যটি চোখে পড়ে টাঙ্গাইলে মধুপুরের বনের ভেতর। যেখানে গড়ে উছেছে ছোট্ট এক বাজার।
সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে দোকানও হাতে গোনা কয়েকটি। দুপুর গড়াতে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন মাটির হাঁড়িতে রান্না করা মাংস খেতে, কেউ আবার স্বজন-অতিথির আপ্যায়নের জন্য বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন সেই মাংস।
চারপাশে সবুজ বন। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে মধুপুরের সৈদালী বাজার। ছোট্ট এই বাজারে দুপুরের পর থেকেই যেন জমে ওঠে ভিন্ন এক আসর। তিন-চারটি দোকানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় ২৫ বছর বয়সি শাকিল আহমেদের ‘মধুবন হোটেল অ্যান্ড টি কর্নার’-এ।
গাজীপুরের কোনাবাড়ী শিল্প এলাকায় ছোট একটি খাবারের দোকান চালাতেন শাকিল। ২০২৪ সালে উচ্ছেদ অভিযানে দোকানটি বন্ধ হয়ে গেলে ফিরে আসেন মধুপুরের নিজ গ্রাম মাগন্তিনগরে। শুরু করেন ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে শুরু হয় নতুন পথচলা।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে এখন তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে মাটির হাঁড়ির মাংসের জন্য। গরু, খাসি, হাঁস, কবুতর ও দেশি মুরগি বিভিন্ন ধরনের মাংস রান্না হয় মাটির হাঁড়িতে।
মধুপুর সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের পাশে জলছত্র বাজার। সেখান থেকে বনভূমির ভেতর আরও প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পেরোলেই সৈদালী বাজার। সেখানে শাকিলের ছোট্ট দোকানটি এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে ভোজনরসিকদের গন্তব্য হিসেবে।

বিশেষ পদ্ধতিতে ধীরে ধীরে রান্না করার পাশাপাশি মসলার সঠিক সংমিশ্রণই এই মাংসের স্বাদকে করে তোলে আলাদা। হাঁড়ির মাংস রান্নায় সাধারণত পেঁয়াজ, আদা, রসুন, হলুদ, মরিচ, ধনে ও জিরা গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। এর সঙ্গে দেওয়া হয় দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, তেজপাতা ও গোলমরিচের মতো আস্ত গরম মসলা। স্বাদ বাড়াতে কাঁচা মরিচ ও পরিমাণমতো লবণ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে সরিষার তেল বা ঘি ব্যবহার করা হয়, যা মাংসে বাড়তি ঘ্রাণ ও স্বাদ এনে দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাকিলের মাটির হাঁড়ির মাংসের গল্প ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে নতুন ক্রেতার আনাগোনা। শুধু মধুপুর নয়, টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলা এমনকি আশপাশের জেলার মানুষও আগে থেকে ফোন করে মাংসের অর্ডার দিয়ে আসেন। অনেকেই বাড়িতে অতিথি এলে আপ্যায়নের জন্য কিনে নিয়ে যান মাটির হাঁড়িতে রান্না করা এই মাংস।
খাবারপ্রেমী রহিম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাকিলের মাটির হাঁড়ির মাংসের কথা জেনেই তিনটি মোটরসাইকেলে ছয় বন্ধু এসেছেন এখানে। প্রত্যন্ত বনের ভেতর এমন স্বাদের মাংস পাওয়া যাবে, তা আগে জানতেন না। একবার খাওয়ার পর স্বাদ ভালো লাগায় আবারও আসার ইচ্ছা রয়েছে তাদের। অন্য রেস্তোরাঁর তুলনায় মাটির হাঁড়িতে রান্না করা এখানকার মাংসের স্বাদই আলাদা।

আরেক খাবারপ্রেমী রাকিব হাসান বলেন, মাটির হাঁড়িতে রান্না করা মাংসের স্বাদই আলাদা। মাংস খুব নরম, আর মসলার ঘ্রাণও বেশ চমৎকার। এমন স্বাদের খাবার খেতে দূর থেকে এসেও ভালো লেগেছে।
সুমন মিয়া বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাটির হাঁড়ির মাংসের কথা জেনে এখানে এসেছি। চুলার আঁচে ধীরে রান্না করায় মাংসে আলাদা একটা স্বাদ এসেছে। খেয়ে সত্যিই তৃপ্তি পেয়েছি।
হোটেল মালিক শাকিল আহমেদ জানান, মাত্র দেড় বছরের মধ্যে তার দোকানের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। প্রতিদিন প্রায় এক মণ গরুর মাংস, ১০ থেকে ১২ কেজি খাসি ও হাঁসের মাংস এবং ৭ থেকে ৮ কেজি দেশি মুরগির মাংস বিক্রি হয়। নিজের হাতে তৈরি বিশেষ মসলার কারণে এই মাংস খেতে সুস্বাদু।



