জামালপুর পাসপোর্ট অফিসে ‘বিশেষ সংকেত’ ছাড়া জমা হয় না ফাইল

জাতীয় পরিচয়পত্র, সরকারি নির্ধারিত ফি এবং প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও জামালপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অফিসের ভেতর-বাইরে সক্রিয় শক্তিশালী দালালচক্রের মাধ্যমে না গেলে কিংবা আবেদনপত্রে বিশেষ ‘সংকেত’ না থাকলে নানা অজুহাতে ফাইল ফেরত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে— দালাল, অফিসের আশপাশের কম্পিউটার দোকান এবং পাসপোর্ট অফিসের অসাধু কর্মীদের ত্রিপক্ষীয় সিন্ডিকেটের চিত্র।
পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে সাধারণ সেবাপ্রার্থী পরিচয়ে জামালপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে যান এই প্রতিবেদক। প্রধান ফটকের সামনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে নামার সঙ্গেই বিনয় নামের এক ব্যক্তি এগিয়ে আসেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি সরাসরি চুক্তিতে কাজ করার প্রস্তাব দেন।
বিনয় দাবি করেন, ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের সরকারি ফি প্রায় সাড়ে ৮ হাজার টাকা হলেও তাদের মাধ্যমে কাজ করালে ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। বিনিময়ে কোনো ঝামেলা ছাড়াই সেবা পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, কাগজে সমস্যা থাকলেও সমস্যা নেই, এনআইডি থাকলেই আমরা সব ঠিক করে দেব। আমাদের মাধ্যমে করলে ফাইল নিয়ে আর ঘুরতে হবে না।
বাড়তি টাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি খোলাসা করে বলেন, নিজেরা কাগজ নিয়ে গেলে জমা নেবে না। আমরা নিলে সমস্যা নেই, কারণ এই টাকার ভাগ পাসপোর্ট অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও দিতে হয়। তবে কোনো কর্মকর্তার নাম বলতে রাজি হননি তিনি।
ফটকে দায়িত্বরত আনসার সদস্য আকাশের সঙ্গে কথা বললেও একই ইঙ্গিত মেলে। তিনি জানান, কাগজে ত্রুটি থাকলেও নির্দিষ্ট লোকজনের মাধ্যমে গেলে আবেদন জমা দেওয়া সহজ হবে।
আবেদনপত্রে গোপন সংকেত
অফিসের আশপাশের কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, আবেদনপত্রে বিশেষ ধরনের চিহ্ন বা সংকেত ব্যবহার করা হচ্ছে। একেক দোকানের সংকেত একেক রকম। কোথাও কালো দাগ, কোথাও ছোট্ট প্রতীক, আবার কোথাও ধর্মের ঘরে কলমের কালি দিয়ে ভরাট করা।
অনুসন্ধানকালে সরাসরি চিহ্ন ছাড়া একটি সঠিক আবেদনপত্র নিয়ে কাউন্টারে গেলে সেটি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো হয়। পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট দোকানের মাধ্যমে একই আবেদনপত্রে গোপন সংকেত বসিয়ে কাউন্টারে জমা দিলে তা সহজেই জমা নেওয়া হয়।
সীমান্ত নামের এক সেবাপ্রার্থী বলেন, নিজে আবেদনপত্র নিয়ে কয়েকদিন ঘুরেও জমা দিতে পারিনি। পরে দালালের শরণাপন্ন হতেই সব ঝামেলা শেষ।
অন্তর নামে আরেক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নতুনদের না চেনার সুযোগ নিয়ে অফিসের বাইরে থেকে ভেতর পর্যন্ত এমন পরিবেশ বানানো হয়েছে, যাতে মানুষ দালাল ধরতে বাধ্য হয়। দালালের ফাইল দ্রুত জমা হয়, আর সাধারণ মানুষ দিনের পর দিন ঘুরছে।
পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জামালপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক রিয়াদ হাসান আবির এশিয়া পোস্টকে বলেন, আপনার মাধ্যমেই প্রথম বিষয়টি জানলাম, লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। আমার অফিসে হয়রানির সুযোগ নেই। তবে তদন্তে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা বাইরের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা মিললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।




