logo
Advertisement

মাদক কারবারিকে সোর্স বানিয়ে গ্রামে ঢুকে ডিবি পুলিশের ‘চাঁদাবাজি’

মাদক কারবারিকে সোর্স বানিয়ে গ্রামে ঢুকে ডিবি পুলিশের ‘চাঁদাবাজি’
বরিশাল জেলা ডিবি পুলিশের এসআই আফজাল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নিরীহ মানুষকে আটক করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি এবং টাকা না দিলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বরিশাল জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে। ডিবির এই ‘আটক বাণিজ্যের’ প্রতিবাদ করায় এক ওয়ার্ড বিএনপি নেতার ছেলেকে ১০১ পিস ইয়াবা দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, ওই এলাকার ব্যবসায়ী ও খামারিদের কাছে নিয়মিত মাসোহারা দাবি এবং তা না দিলে অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে এসব পুলিশ সদ্যস্যের বিরুদ্ধে।

বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড মোল্লাপাড়ায় এই ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবিতে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী জাফর হাওলাদার।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল জেলা ডিবি পুলিশের এসআই আফজাল ও এএসআই রাজিব পালের নেতৃত্বে মোল্লাপাড়া ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের এসব কাজে সহায়তা করে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী নয়ন ঢালী (৩৫) ও ভদ্রপাড়া এলাকার শাহিন সরদার। এই দুই মাদক কারবারিকে ‘সোর্স’ হিসেবে ব্যবহার করে ডিবি পুলিশের সদস্যরা প্রায় প্রতিদিনই সাদা পোশাকে গ্রামে ঢুকে বিভিন্নজনকে আটক করে এবং টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়।

সেই ধারাবাহিকতায় গত ১১ আগস্ট রাতে মোল্লাপাড়ায় জাফর হাওলাদারের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার ছেলে নাদিম, প্রতিবেশী সাব্বির ও সোহাগকে আটক করা হয়। তার আগে একই এলাকার সাহেবের হাট বাজার থেকে নয়ন ঢালী ও শাহিন সরদারকে হাতকড়া পরিয়ে জাফর হাওলাদারের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে জাফর হাওলাদারের ছেলে নাদিমকে ছাড়তে দুই লাখ টাকা এবং অন্যদের প্রত্যেকের কাছে ৩০ হাজার টাকা করে দাবি করা হয়।

ডিবি পুলিশের সোর্স হিসেবে অভিযুক্ত নয়ন ঢালী বলেন, ওইদিন কারো কাছেই কিছুই পাওয়া যায়নি। আমাকে সাহেবের হাট থেকে আর শাহিন সরদারকে ভদ্রপাড়া থেকে হাতকড়া পরিয়ে মোল্লাপাড়ায় জাফর হাওলাদারের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। আমার পকেট থেকে ১২ হাজার টাকা ডিবি পুলিশই নিয়ে যায়। পরে আরো দুই হাজার টাকা বিকাশে পাঠাই। নাদিমকে ১০১ পিস ইয়াবাসহ চালান দেওয়া হলেও আটকের সময় তার কাছে কিছু পেতে দেখিনি। পুলিশই সব সাজাইছে।

ঘটনার স্থান পরিবর্তন ও মামলার বিষয়ে মামলার এক নম্বর সাক্ষী লাল মিয়া বলেন, রাত ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার সময় জাফর ভাইদের বাড়ির সামনে লোকজন দেখে এগিয়ে গিয়ে দেখি নাদিমসহ ৫ জনকে আটক করে রাখা হয়েছে। পরে আমরা মধ্যস্থতা করে চারজনকে ছাড়িয়ে আনি। সাহিন ও নয়ন কত দিয়েছে জানি না, তবে সাব্বির ও সোহাগের পরিবার ধারদেনা করে ৩০ হাজার টাকা করে দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নেয়।

তিনি আরও বলেন, ডিবি পুলিশ আমাদের জানিয়েছিল তারা মুরগির খামারি কাওছারকে ধরতে এসেছেন। কিন্তু তাকে নাদিম চেনে—এমন অজুহাতে নাদিমকে আটক করা হয়। পরে জানতে পারি আমাকে মামলার সাক্ষী করা হয়েছে। মোল্লাপাড়া থেকে নাদিমাকে ধরে নেওয়া হলেও মামলায় ঘটনাস্থল দেখানো হয়েছে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া, যার দূরত্ব সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। ওই মামলায় গৌরনদীর আরও দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। দুটি ভিন্ন ঘটনা ও অভিযানকে কীভাবে একটি মামলায় এক করা হলো, তা আমার মাথায় আসছে না।

মোল্লাপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও খামারি কাওছার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ডিবি পুলিশ ফোনে কল করে প্রতি মাসে টাকা চায়। টাকা না দিলে অস্ত্র ও মাদক দিয়ে ফাঁসানোর হুমকি দেয়। ঘরের বটি, গোসল করার সাবান, এমনকি গাছের কলাও ডিবি পরিচয়ে নিয়ে গেছে। এখন আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার ভাইয়ের ছেলে নাদিমকেও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে, সে এখন জেলে। সেই রাতে আমাদের কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল, দিতে পারিনি বলেই ওকে চালান দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী জাফর হাওলাদার বলেন, আমার দুই ছেলেকে ধরেছিল। এক ছেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাকে ছেড়ে দিলেও নাদিমকে নিয়ে যায়। এসআই আফজাল ২ লাখ টাকা দাবি করেন। আমি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ১০১ পিস ইয়াবা উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে মাহিলাড়ার একটি মামলায় চালান দেয়। আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে তুলে নিলেও উদ্ধার দেখানো হয়েছে মাহিলাড়ায়। ডিবি পুলিশের হয়রানিতে আমাদের পুরো গ্রাম এখন পুরুষশূন্য। প্রতি রাতে এসে তারা ধরা-ছাড়ার বাণিজ্য করছে। সংবাদ সম্মেলন ও ডিআইজির কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকেও মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই আফজাল বলেন, আগৈলঝাড়ার মোল্লাপাড়ার ওই ঘটনার বিষয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো কথা বলতে পারব না।

এ বিষয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, আমি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি এবং মামলাটি পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। এক স্থান থেকে আটক করে অন্য স্থান দেখানো কোনোভাবেই সমর্থযোগ্য নয়। তদন্তে আমার কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণের প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।