logo

প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে রাঙামাটির ৪৩৮ প্রাথমিক বিদ্যালয়

জিয়াউল হক
রাঙামাটি
প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে রাঙামাটির ৪৩৮ প্রাথমিক বিদ্যালয়
হাজাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাঙামাটিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোথাও দু-তিনজন শিক্ষক দিয়েই চলছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। ফলে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা।

জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, জেলার ৭০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৩৮টিতেই নেই কোনো প্রধান শিক্ষক। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকের ৭৫৯টি পদ খালি থাকায় মোট এক হাজার ১৯৭টি পদের শূন্যতা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম।

শূন্যপদ পূরণে ২০২২ সালের মে মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয় একই বছরের ২৩ অক্টোবর। কিন্তু ৪০ বছর বয়সসীমা নিয়ে স্থগিতাদেশের কারণে পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। পরে ২০২৪ সালের ২৪ মে পুনরায় পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হলেও পরীক্ষার্থীদের বয়স নির্ধারণের বিষয়টি সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

পার্বত্য চুক্তির শর্তানুসারে, তিন পার্বত্য জেলার মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ স্থানীয় জেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত। সেই হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বয়সসীমা ৪০ থেকে ৩২ নির্ধারণ করে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জেলা পরিষদ। পরীক্ষার তারিখ দেওয়া হয় ১৪ অক্টোবর। কোটাব্যবস্থা নিয়ে জেলা পরিষদের সঙ্গে স্থানীয় দুটি পক্ষ বিভক্ত হয়ে আন্দোলন শুরু করে। পরে সেই পরীক্ষাও স্থগিত হয়। এরপর একই বছরের ২১ নভেম্বর পুনরায় পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হলেও কোটাব্যবস্থা সমাধানের দাবিতে শহরে হরতাল পালন করা হলে সেই পরীক্ষাও স্থগিত করে জেলা পরিষদ।

একটি পক্ষের দাবি, সারা দেশের মতো ৯৩ শতাংশ মেধা ও ৭ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হোক। অপর পক্ষের দাবি, জেলা পরিষদের আইন অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হোক। বর্তমানে কোটাব্যবস্থা সমাধানের জন্য ফাইল আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। এখন পর্যন্ত এই সমস্যা সমাধানে কেউ উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা।

রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৭০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ৭০৭টি। বর্তমানে জেলায় কর্মরত আছেন ২৬৯ জন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে রাঙামাটি সদর উপজেলায় ৪৬টি, কাউখালী উপজেলায় ৩৭টি, নানিয়ারচর উপজেলায় ৩৫টি, বরকল উপজেলায় ৩৫টি, জুরাছড়ি উপজেলায় ১৯টি, লংগদু উপজেলায় ৬০টি, বাঘাইছড়ি উপজেলায় ৮৩টি, কাপ্তাই উপজেলায় ২৬টি, রাজস্থলী উপজেলায় ৩৯টি এবং বিলাইছড়ি উপজেলায় ৯টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।

প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি বর্তমানে জেলায় সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩ হাজার ৩৩২টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ২ হাজার ৫৭৩ জন। ফলে রাঙামাটিতে ৭৫৯টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।

শূন্য পদের মধ্যে রাঙামাটি সদর উপজেলায় ৪৯টি, কাউখালী উপজেলায় ৫১টি, নানিয়ারচর উপজেলায় ৬৩টি, বরকল উপজেলায় ৭৫টি, জুরাছড়ি উপজেলায় ৭৩টি, লংগদু উপজেলায় ১১২টি, বাঘাইছড়ি উপজেলায় ১৬৩টি, কাপ্তাই উপজেলায় ৩৪টি, রাজস্থলী উপজেলায় ৭৪টি এবং বিলাইছড়ি উপজেলায় ৬৫টি পদ শূন্য রয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাঙামাটি জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষক হিসেবে যে সংখ্যা দেখানো হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেই সংখ্যা আরও কম বলে জানা গেছে। পূরণকৃত পদ হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে ওই শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে কর্মরত নেই। এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মরত শিক্ষকদের একটি অংশ রাঙামাটি জেলা সদরের পিটিআইয়ে দেড় বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণে নিয়োজিত আছেন। পরিসংখ্যানগতভাবে তাদের বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

অপরদিকে, পিডিপি-৩, স্লিসহ প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন প্রশিক্ষণে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক হওয়ায় বছরের একটি উল্লেখযোগ্য সময় তাদের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকতে হয়। এ কারণে বিদ্যালয়ে না থেকেও তাদের কর্মরত হিসেবে দেখানো হয়। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মেডিকেল ছুটি, সিএল ছুটিও রয়েছে।

বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা কিংবা উপজেলা সদর অথবা যোগাযোগ সুবিধায় অবস্থিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট তুলনামূলকভাবে কম। তবে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট প্রকট। প্রত্যন্ত এলাকার এমন একাধিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে একজন কিংবা দুজন শিক্ষক কর্মরত। আবার এমন বিদ্যালয়ও আছে, যেখানে সর্বসাকল্যে শিক্ষার্থী রয়েছে ১৫ থেকে ২০ জন।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কফিল উদ্দিন বলেন, জনবল কম থাকায় শিক্ষকদের বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। তারা তাদের সবটুকু দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। শিক্ষক নিয়োগের জন্য অনেকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সমাধানে আইন মন্ত্রণালয়ে আছে শুনেছি। আবার শুনেছি, আইন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছে—মেধায় ৯৩ ভাগ ও কোটায় ৭ ভাগের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া করার জন্য। তবে এখনো এমন কোনো পত্র পাইনি।

রাঙামাটি জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট প্রতীম রায় পাম্পু বলেন, যে মতামত এসেছে, এটিই সঠিক। আইনের মাধ্যমেই চুক্তি হয়েছে। পূর্বে নিয়োগে ‘অগ্রাধিকার’ শব্দটি ব্যবহার করত জেলা পরিষদ, তাতে অব্যবহার করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে আর কোনো জটিলতা সৃষ্টি হবে না।

তিনি আরও বলেন, এখন অগ্রাধিকার বলতে বোঝানো হয়েছে, পরীক্ষায় একটি পদের জন্য একজন বাঙালি ও একজন উপজাতি পরীক্ষার্থী অংশ নিলেন। সেখানে উভয়ে সমান নম্বর পেলে তখন উপজাতি পরীক্ষার্থী অগ্রাধিকার পেতে পারেন।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার বলেন, চাকরিতে সারা দেশের ন্যায় ৯৩ শতাংশ মেধা ও ৭ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পেয়েছি। সরকার যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, সেভাবেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাজ চলমান রয়েছে। দ্রুত নিয়োগ শেষ করে বিদ্যালয়গুলোতে যে শিক্ষক সংকট রয়েছে, তা দূর করতে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। নিয়োগ শেষ হলেই এই সংকট দূর হবে।