logo

দুই দশক ধরে অচল ট্রাফিক সিগন্যাল, যানজটে নাকাল খুলনা নগরবাসী

মাসুম বিল্লাহ ইমরান
খুলনা
দুই দশক ধরে অচল ট্রাফিক সিগন্যাল, যানজটে নাকাল খুলনা নগরবাসী
খুলনা মহানগরীর একটি মোড়ে ঝুলছে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকা ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি। ছবি : এশিয়া পোস্ট

যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে নগরবাসীর চলাচলও। অথচ দুই দশকের বেশি সময় ধরে কার্যকর ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা নেই খুলনা মহানগরীতে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে কোথাও অচল সিগন্যাল বাতি পড়ে আছে, কোথাও আবার তার অস্তিত্বও নেই। ফলে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বদলে এখনো ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে নগরীর যান চলাচল। এতে যানজট ও বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি পথচারীদের ঝুঁকিও বাড়ছে।

সোনাডাঙ্গা, শিববাড়ী, গল্লামারী, ময়লাপোতা ও নিউমার্কেটসহ ব্যস্ত এলাকাগুলোতে দিনের বড় সময় যানবাহনের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। সিগন্যাল না থাকায় মোড়ে মোড়ে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এতে অনেক সময় আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েন চালকেরা, তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। আর ব্যস্ত সড়ক পার হতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি ও ঝুঁকিতে পড়েন পথচারীরা।

নগরবাসীর অভিযোগ, যানজট এখন অনেকটা নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিটিআই মোড়ের বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুম বলেন, খুলনা শহরে অনেক যানজট বাধে, ঝামেলা হয়, ট্রাফিক জ্যাম হয়। যে যার মতো চলাফেরা করে।

পাওয়ার হাউস এলাকার পথচারী সাগর হিরমন বলেন, পথচারীদের সড়ক পার হতে গেলে অনেক কষ্ট হয়। জীবন ঝুঁকি নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে।

জান্নাতুল ফেরদাউশ পুষ্পিতা বলেন, আগে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন দরকার এবং ডিজিটাল সিগন্যাল লাইটের দরকার।

তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনা রোধ ও যানজট নিরসনে ১৯৮৭ সালের দিকে খুলনা মহানগরীর ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়। কিন্তু ২০০৫ সালের মধ্যে সব কটি সিগন্যাল অকার্যকর হয়ে পড়ে। ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনেও খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) সূত্রের বরাত দিয়ে একই তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নগরীতে কার্যকর স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু হয়নি।

অচল সিগন্যালগুলোর অনেকগুলোর অস্তিত্বও এখন আর চোখে পড়ে না। কোথাও বাতি থাকলেও তা সচল নয়। ফলে আধুনিক নগরীর উপযোগী স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার পরিবর্তে পুরোনো পদ্ধতিতেই চলছে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ বলেন, নগরীর যানজট নিরসনে মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে তারা আলোচনা করছেন। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে আরও আধুনিক ও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে বসে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার সমাধানে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

কেএমপির ট্রাফিক পুলিশের সদস্য বখতিয়ার বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বহু বছর আগে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি ছিল। তখন অনেকে সিগন্যাল মানতেন এবং তাদের মধ্যে এ বিষয়ে একটি অভ্যস্ততাও তৈরি হয়েছিল।

কেএমপির ট্রাফিক সার্জেন্ট হাসিব বলেন, সোনাডাঙ্গা মোড়, শিববাড়ী মোড়, গল্লামারী মোড়ের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিকের চাপ খুবই বেশি থাকে। যদি সিগন্যাল বাতির ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে আমি আশা করি আমাদের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) শফিকুল ইসলাম বলেন, খুলনায় কার্যকর ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং বিষয়টি আইজিপির কাছেও উত্থাপন করা হয়েছে।

শফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ঢাকায় এআই প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু রয়েছে। খুলনাতেও এ ধরনের প্রযুক্তি চালুর দাবি জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চট্টগ্রামের পর খুলনায়ও পর্যায়ক্রমে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে শুধু সিগন্যাল বাতি স্থাপন করলেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না বলে মনে করছে পুলিশ। চালক ও পথচারী উভয়েরই ট্রাফিক আইন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।

এদিকে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে কেসিসি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

কেসিসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, বিশেষজ্ঞ টিম বলতে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আছেন, বুয়েটের শিক্ষকেরাও আছেন। তাদের সবাইকে মিলেই একটি ডিপিপি প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, ১৯৮৭ সালে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সিগন্যাল স্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো অচল থাকার পর নতুন ব্যবস্থা কবে বাস্তবে চালু হবে?

যানবাহনের চাপ ও মানুষের চলাচল বাড়লেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সেই অনুযায়ী আধুনিকায়ন না হওয়ায় সমস্যাটি দিন দিন প্রকট হচ্ছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে কেসিসি ও কেএমপির সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করাই শেষ কথা নয়; সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নই এখন বড় প্রশ্ন। কার্যকর সিগন্যাল ব্যবস্থা, নিরাপদ পথচারী পারাপার, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগে সমন্বিত উদ্যোগ না এলে নগরীর যানজট ও জনভোগান্তি কমানো কঠিন হবে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন বলেন, শুধু ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করলেই খুলনার যানজট কমবে না। নগরীর বিপুলসংখ্যক অটোরিকশাসহ বিকল্প যানবাহনের কারণে সিগন্যালের পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং ও ট্রাফিক আইন মানার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার ও আইন প্রয়োগ দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, জেব্রা ক্রসিং ও ট্রাফিক জংশনগুলোকে পথচারীবান্ধব করে নতুনভাবে নকশা করা প্রয়োজন। সড়ক, ফুটপাত, পথচারী পারাপার ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, কেডিএ ও কেসিসির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। অনেক সড়কে লেন বিভাজন ও সড়ক-ফুটপাতের যথাযথ সমন্বয় নেই। ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কয়েকটি জংশন ও পুলিশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

স্বল্পমেয়াদে রুটভিত্তিক যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারণ, অটোরিকশাকে রুট অনুযায়ী আলাদা রঙে চিহ্নিত করা এবং গল্লামারী, ময়লাপোতা, শিববাড়ী ও নিউমার্কেটের মতো এলাকায় যত্রতত্র পার্কিং বন্ধের পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি হাসপাতাল ও স্কুলের সামনে নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকা এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা কার্যকরের ওপর গুরুত্ব দেন।

দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন রুটে প্রকৃত গণপরিবহন চালু, নির্দিষ্ট স্টপেজ ও পার্কিং ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সড়ক প্রশস্ত করার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক সালাউদ্দীন বলেন, একটি শহরের প্রাণ হলো তার সড়ক। সড়ক দখল করে রাখা হলে এবং বিকল্প পরিবহন নিয়ন্ত্রণে না আনলে খুলনায় সুষ্ঠু, নিরাপদ ও জনবান্ধব ট্রাফিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।