logo
Advertisement

ভারত থেকে দুই মাসে সাড়ে ৩ লাখ কেজি ইলিশ আমদানি, নেই দেশি স্বাদ

ভারত থেকে দুই মাসে সাড়ে ৩ লাখ কেজি ইলিশ আমদানি, নেই দেশি স্বাদ
বাজারে ইলিশ মাছ বিক্রেতা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট— এই দুই মাসে ভারত থেকে সাড়ে তিন লাখ কেজিরও বেশি ইলিশ মাছ আমদানি করা হয়েছে। বিষয়টি এশিয়া পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন বেনাপোল ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন অফিসার সজীব সাহা। তবে এসব ইলিশে মিলছে না দেশি ইলিশের স্বাদ।

আমদানির এই বিপুল প্রভাব পড়েছে যশোরের স্থানীয় মাছের বাজারে। তবে বিদেশি ইলিশকে দেশি ইলিশ বলে বিক্রির অভিযোগ ওঠায় বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।

ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ দুই মাসে মোট ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এসব মাছ আমদানি করেছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— বেনাপোলের মেসার্স সততা ফিস, মেসার্স রাব্বি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সততা ফিস ফিড, মেসার্স ফেমাস ট্রেডার্স, মেসার্স রিয়ান্স হাব, যশোরের মেসার্স এইচএমআর ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স এনকে ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স সুরাইয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স আরকিন ইন্টারন্যাশনাল, বাগআঁচড়ার মেসার্স জনতা ফিস, ঢাকার মেসার্স স্বর্ণালী এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স রুপা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মারিয়াম এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সাজ্জাদ এন্টারপ্রাইজ, যাত্রাবাড়ি, খুলনার মেসার্স বিশ্বাস ইন্টারন্যাশনাল, সাতক্ষীরার মেসার্স জান্নাত এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স আশিক এন্টারপ্রাইজ ও পাবনার মেসার্স নোমান এন্টারপ্রাইজসহ ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।

বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জুলাই মাসে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশ মাছ বাংলাদেশে এসেছে। এছাড়া আগস্ট মাসে ১৯টি আমদানি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ইলিশ আমদানি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমদানি করা এসব ইলিশের মূল্য দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। এরমধ্যে জুলাইতে আমদানি করা ইলিশের মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা এবং আগস্টে ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ইলিশ আমদানি হওয়ায় বেনাপোল, শার্শা, বাগআঁচড়া, নাভারণ, যশোর বড় বাজারসহ জেলার বিভিন্ন মাছের বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের কাছে এসব মাছ ‌‌‘মিয়ানমারের ইলিশ’ নামে পরিচিত। ক্রেতাদের অভিযোগ, দেশি ইলিশ মনে করে এসব মাছ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন তারা। স্বাদ ও গন্ধে দেশি ইলিশের সঙ্গে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাকে তা জানানো হচ্ছে না।

যশোরের আড়তদারদের ভাষ্য, মিয়ানমারের এসব মাছ ভারত হয়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। তবে বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বেনাপোল দিয়ে আসা এসব ভারতীয় ইলিশ। মিয়ানমার থেকে যে ইলিশ আসছে সেগুলো চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রবেশ করে। তবে বাজারে মিয়ানমারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে বলে তারা নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে একটি সূত্রের দাবি, অনেক ইলিশ অবৈধভাবেও দেশে এসেছে। গত ২২ জুলাই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সাদা মাছের ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা ১২ কার্টন (প্রায় ৩৬০ কেজি) ভারতীয় ইলিশ মাছ। যা জব্দ করে বেনাপোল কাস্টম কর্তৃপক্ষ।

যশোর বড় বাজারে ইলিশ কিনতে আসা লোন অফিসপাড়ার বাসিন্দা সাজেদুর রহমান বলেন, দেশি ইলিশ মনে করেই একটি মাছ কিনেছি। পরে খাওয়ার পর বুঝতে পারি, মাছটির স্বাদ ও গন্ধ দেশি ইলিশের মতো নয়। দেখতে প্রায় একই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বিদেশি ও দেশি ইলিশের পার্থক্য বোঝা কঠিন।

বাজারের ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১ কেজি ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে। বিপরীতে ১ কেজি ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের কথিত মিয়ানমারের ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা কেজি। অর্থাৎ আকারে বড় হলেও বিদেশি ইলিশের দাম দেশি ইলিশের তুলনায় অনেক কম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই যশোরের বাজারে ‘সস্তার’ ক্রেতাদের একটি বড় অংশ কম দামের মাছের দিকে ঝুঁকছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, যশোর বড় বাজারের পদ্মা ফিস, গৌরব ফিস, মেসার্স তিতাস ফিস ও মেসার্স জামান ফিসসহ কয়েকটি আড়তে এসব মাছ ওঠানো হচ্ছে। অন্যদিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি তথ্য বলছে, আগস্ট মাসেই ইলিশ আমদানির পরিমাণ জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেড়েছে। জুলাইয়ে যেখানে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছিল, আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজিতে। এই বিপুল পরিমাণ মাছের একটি অংশ যশোরের বাজারে আসার ফলে দেশি ইলিশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

বড় বাজারের মাছ ব্যবসায়ী মেসার্স শেখ পিয়ারু ফিসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ পিয়ারু এশিয়া পোস্টকে জানান, এসব মাছ বার্মা (মিয়ানমার) থেকে ভারত হয়ে আসছে।

দেশি ইলিশ ব্যবসায়ী সত্যপদ, এরশাদ ও মো. আলমগীরসহ কয়েকজন বলেন, কম দামে বড় আকারের এসব বিদেশি ইলিশ বাজারে আসায় দেশি ইলিশের বিক্রি কমে গেছে। ক্রেতারা দামের পার্থক্যের কারণে বিদেশি মাছ কিনছেন। এতে প্রকৃত দেশি ইলিশ ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিদেশি ইলিশকে দেশি ইলিশের নামে বিক্রি করা হলে একই সঙ্গে দুটি পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতারণার শিকার হচ্ছেন ক্রেতারা এবং বাজার হারাচ্ছেন দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরা।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করি। তবে ব্যবসায়ীরা আমদানি করা মাছ দেশি বলে বিক্রি করলে আমাদের আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি না। কারণ বিষয়টি মৎস্য আইনে কাভার করে না।

জানতে চাইলে যশোর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমদানি করা ইলিশ অবশ্যই ঘোষণা দিয়ে বিক্রি করতে হবে। এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।