একটু সম্মান আর সচ্ছলতায় গান গেয়ে কাটিয়ে দিতে চান রনজিৎ

‘আজ ১৮ বছর পরে পুরোনো দিঘির পাড়ে একা একা গেলাম যখন...’ — কালজয়ী এ গান কাল্পনিক নয়। বাস্তব জীবনের মায়াবী সুরে গাওয়া গানের চরণগুলো শুনলে মনে হয় সময় যেন থমকে গেছে। অসামান্য কণ্ঠের সুধা ছড়িয়ে শ্রোতাদের স্মৃতির অবগাহনে ভাসিয়ে দিচ্ছেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার তুলশিরামপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রনজিৎ কুমার সাহা। জীবনের পরতে পরতে অভাব-অনটন থাকলেও, তা তার ভেতরের সুরের ধারাকে থামাতে পারেনি।
রেডিওতে বাজানো গান শুনেই রনজিতের সংগীতচর্চার শুরু। কোনোদিন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মেলেনি, তবে প্রাতিষ্ঠানিকতার ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে তার স্বাভাবিক প্রতিভা। হিন্দু ধর্মের অনুসারী হলেও তার কণ্ঠের বৈচিত্র্য ছিল নজরকাড়া। কালজয়ী বাংলা গানের পাশাপাশি ‘বক্ষে আমার কাবারও ছবি’ বা ‘চোখে মোহাম্মদ রাসুল’ -এর মতো সুরেল গজল গেয়ে স্কুলজীবনেই কুড়িয়েছেন অগণিত পুরস্কার।
তবে অভাবের চাকা থামিয়ে দেয় তার পথচলা। মাধ্যমিক পরীক্ষার পরেই পড়ালেখায় ইতি টানতে হয়, সেই সঙ্গে থমকে যায় পেশাদার শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন। রনজিৎ সাহা জানান, শৈশবে পড়ালেখার চেয়ে গান মুখস্থ করার প্রতিই তার টান ছিল বেশি। ইচ্ছা ছিল অনেক বড় শিল্পী হবেন, কিন্তু দারিদ্র্যের কাছে নিজের সেই ইচ্ছা বিসর্জন দিতে হয়। তা সত্ত্বেও সংসার জীবনের তীব্র কষ্টের মাঝেও মনের খোরাক হিসেবে গানকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তিনি।
সংগীতকে মূল পেশা বানাতে না পারলেও এটি তার অস্তিত্বের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। একসময় যাত্রাদল ও কীর্তনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, পাশাপাশি পেট চালানোর জন্য কখনো কাঠের ব্যবসা আবার কখনো আম বিক্রির কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে নেমে এসেছে ট্র্যাজেডির ছায়া। একে একে মারা যান স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী একমাত্র কন্যা। বর্তমানে তিনি পুরোপুরি একা। শহরের এক মেসে থেকে টিউশনি করা একমাত্র ছেলে তার খোঁজখবর ও ভরণপোষণ চালান। একটি মাত্র জরাজীর্ণ টিনের ঘরে নিঃসঙ্গ দিন কাটানো রনজিতের এখন একমাত্র সঙ্গী তার কণ্ঠের সুর।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার গান গাওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে আলোচনায় আসেন এই প্রচারবিমুখ সাধক। নেটিজেনদের পাশাপাশি স্থানীয়রা এখন তার সুমধুর কণ্ঠে মুগ্ধ। গ্রামে কিংবা আশপাশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এখন তার ডাক পড়ে, আর পথচলতি মানুষ গান শোনার আবদার করলে তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না।
জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে কোনো বড় চাওয়া-পাওয়া নেই রনজিৎ সাহার। তিনি বলেন, বাকি জীবনটুকু যেন একটু সম্মান ও সচ্ছলতার সঙ্গে গান গেয়ে কাটিয়ে দিতে পারি— এটাই শুধু চাই।
স্থানীয়দেরও দাবি, প্রতিভাবান এই প্রবীণ শিল্পীর শেষ দিনগুলো যেন সুর ও সম্মানের আলোয় উজ্জ্বল থাকে।
এ বিষয়ে মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আখতার জাহান সাথি এশিয়া পোস্টকে জানান, প্রান্তিক এলাকার এই অসামান্য প্রতিভাবান শিল্পীর পাশে দাঁড়াবে উপজেলা প্রশাসন। সরকারি সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি তার আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।


