logo

ইনানীতে গ্যাসের আগুন জ্বলছেই, ২০০ মিটারে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

ইনানীতে গ্যাসের আগুন জ্বলছেই, ২০০ মিটারে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের স্থান থেকে বের হওয়া গ্যাসে আগুন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের স্থান থেকে বের হওয়া গ্যাসে আগুন জ্বলছেই। গত মঙ্গলবার ভোরে শুরু হওয়া আগুন বুধবারও (২৮ অক্টোবর) নেভেনি। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে মানুষের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। অপরদিকে আশপাশের বাড়িঘরের বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ গ্যাসের আধার থেকে উচ্চচাপে গ্যাস বের হয়ে আসছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন তারা। তবে গ্যাসের প্রকৃতি ও উৎস নিশ্চিত হতে নমুনা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সাত দিন সময় নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল।

এদিকে আগুনের কারণে মেরিন ড্রাইভের আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছেন। বিকল্প লাইন নির্মাণ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ প্রায় ১৫ দিন আগে ওই স্থানে নলকূপ খননের কাজ শুরু করেন। মঙ্গলবার ভোরে খনন স্থল থেকে হঠাৎ গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে বৈদ্যুতিক তার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর থেকে গ্যাস নির্গমন অব্যাহত রয়েছে এবং আগুন জ্বলছে, যা অব্যাহত রয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাতে জরুরি ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বাপেক্সের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলনেতা এসএম নাফিকুন আরহামের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ দলটি পুনরায় ঘটনাস্থলে যায়। এসময় আশপাশের পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি মাটি, পাথর ও পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

এস এম নাফিকুন আরহাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঘটনাস্থল থেকে পাথর ও পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে গ্যাস নির্গমন শুধু নলকূপ খননের স্থানেই সীমাবদ্ধ নেই। আশপাশের বিভিন্ন স্থান দিয়েও গ্যাস বের হচ্ছে। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, প্রায় এক হাজার ফুট গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। তবে খননের সময় এভাবে গ্যাসের উপস্থিতি বোঝা যায়নি। মঙ্গলবার ভোর থেকে গ্যাসের অস্তিত্ব অনুভূত হয় এবং পরে তা আগুনের শিখা আকারে জ্বলতে শুরু করে। ভূগর্ভস্থ গ্যাসের আধার থেকে এ গ্যাস বের হচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

গ্যাসের উপাদান সম্পর্কে এই কর্মকর্তা বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাসে সাধারণত মিথেনের পাশাপাশি ইথেন, প্রোপেন, বিউটেন ও পেন্টেনের মতো হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে। তবে এখানকার গ্যাসের সঠিক উপাদান পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। আগুনের রং ও ধোঁয়ার ধরন দেখে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।

এটি নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানান এস এম নাফিকুন আরহাম।

আগুন নেভানোর বিষয়ে এসএম নাফিকুন আরহাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্যাস জ্বলতে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ‘রিলিফ ওয়েল’ খনন করে ভূগর্ভে সিমেন্ট পাম্পের মাধ্যমে গ্যাসের প্রবাহ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বাপেক্সের এই কর্মকর্তা জানান, তারা সাত দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

এদিকে আগুনের ঘটনার পর মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে মেরিন ড্রাইভের আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে।

কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উখিয়া জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী কাইজার নুর এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাপেক্সের প্রতিনিধিদলের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করা হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থায় প্রায় ২০০ মিটার বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা সম্ভব হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল হক জানান, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর থেকে তারা ভোগান্তিতে রয়েছেন। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ চান তারা।

এদিকে আগুন দেখতে বুধবার সকাল থেকেই ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা যায়। সড়কে ব্যারিকেড দেওয়া হলেও অনেকে তা অমান্য করে ঘটনাস্থলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিকদার বাজার এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল হক বলেন, আগের দিনের তুলনায় বুধবার আগুনের তীব্রতা বেড়েছে বলে তাঁদের মনে হচ্ছে। সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন।

আরেক বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ জানান, তারা পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন। তবে বাড়িতে থাকা মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আগের দিনের তুলনায় আগুনের তীব্রতা বেড়েছে এবং বিভিন্ন স্থান দিয়ে গ্যাস বের হতে দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঘটনাস্থল ঘিরে নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে কেউ ২০০ মিটারের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারেন। আগুন দেখতে অতিউৎসাহী হয়ে কেউ যেন ঘটনাস্থলে ভিড় না করেন, সে জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। আগুন কখন স্বাভাবিকভাবে নিভে আসে, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।