logo

স্মৃতিচিহ্নে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বিরোধী ‘প্রথম সশস্ত্র যোদ্ধা’ শমসের গাজী

মিজানুর রহমান
ফেনী
স্মৃতিচিহ্নে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বিরোধী ‘প্রথম সশস্ত্র যোদ্ধা’ শমসের গাজী
প্রতিকৃতিতে ‘ভাটির বাঘ’ শমসের গাজী। ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার চম্পকনগরে। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

‘ভাটির বাঘ’ ও ‘প্রজাদরদি রাজা’–এমন জনশ্রুত নানা উপাদিতে ভূষিত শমসের গাজী। তিনি ছিলেন একজন শাসক। আরেকটি পরিচয় হলো; তিনি একজন বিপ্লবী। এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে বিপ্লব করেছিলেন তিনি। কথিত আছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে তিনি প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তার স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শনগুলো রক্ষণাবেক্ষণে নেই তেমন উদ্যোগ। বিস্মৃত হতে চলেছেন এই কিংবদন্তি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়–বর্তমান ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলায় জন্ম নেন এই ‘ভাটির বাঘ’ শমসের গাজী। তার বাবার নাম পীর মুহাম্মদ (মতান্তরে পেয়ার মুহাম্মদ খান)। মায়ের নাম কৈয়্যারা বিবি। প্রথম জীবনে ছিলেন এক জমিদারের ক্রীতদাস। নিজের জ্ঞান, শক্তি, দক্ষতা ও পরিশ্রমের জোরে একসময় তিনি নিজে হয়ে ওঠেন জমিদার।

আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা ও ত্রিপুরা অঞ্চলের মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন শমসের গাজী। তার লক্ষ্য শোষক জমিদার এবং মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাত থেকে শোষিত মানুষকে রক্ষা করা। গড়ে তুলেছিলেন বিশাল লাঠিয়াল ও শক্তিশালী বাহিনী। টানা এক যুগ শাসন করেন ত্রিপুরা রাজ্য।

এই বীরের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল ইংরেজ বেনিয়ারাও। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। পরে ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ও তাদের দোসরদের চক্রান্তের শিকার হয়ে তিনি শহীদ হন।

সীমান্ত ঘেঁষে টিকে আছে স্মৃতিচিহ্ন

ছাগলনাইয়া উপজেলার চম্পকনগরে রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে শমসের গাজী স্থাপন করেছিলেন তার রাজধানী, কেল্লা ও রাজপ্রাসাদ। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষা চম্পকনগর ও জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামে তার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গ পথ, সুবিশাল ‘খুইল্লার দিঘি’ (কৈয়ার দিঘি) এবং রাজপ্রাসাদের কেল্লার ভিটা রয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষা চম্পকনগর ও জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামে শমসের গাজীর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গ পথ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষা চম্পকনগর ও জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামে শমসের গাজীর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গ পথ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্থানীয়দের তথ্যমতে, তার প্রাসাদসহ অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ এখন ভারতের ত্রিপুরার মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে।

অবিভক্ত বাংলায় তৈরি হওয়া শমসের গাজীর সুড়ঙ্গটির বর্তমানে দুই দেশে দুই মুখ রয়েছে—একমুখ বাংলাদেশে, অন্যমুখ ভারতে। এই সুড়ঙ্গ পথটি নিয়ে রয়েছে অনেক গল্প ও উপাখ্যান। জনশ্রুতি আছে–গাজীর পরিবারের নারী সদস্যরা এই পথ দিয়ে গোসলে যেতেন।

সুড়ঙ্গের অদূরে রয়েছে চার দশমিক ৩৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত শমসের গাজীর দিঘী, যা ‘এক খুইল্লা দিঘী’ নামেও পরিচিত।

শমসের গাজীর স্মৃতি ধরে রাখতে ব্যক্তি উদ্যাগে নির্মিদ স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট’। নবাবের স্মৃতি ধরে রাখতে তার বংশধর, পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঞাঁ পাঁচ একর জায়গায় এই রিসোর্টটি তৈরি করেন।

রিসোর্টের প্রতিটি আসবাবপত্র ও কাঠামো বাঁশের নান্দনিক নির্মাণশৈলীতে তৈরি। এখানে রয়েছে ফল-ফুলের বাগান এবং খাগড়াছড়ির ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি ঘরের নমুনা; যা দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন।

শমসের গাজীর স্মৃতি রক্ষায় নির্মিত রিসোর্ট। ছবি: এশিয়া পোস্ট
শমসের গাজীর স্মৃতি রক্ষায় নির্মিত রিসোর্ট। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের দাবি

স্থানীয়দের দাবি, শমসের গাজীর ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গ, দিঘি ও কেল্লার ভিটা সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের কাছে তার বীরত্বগাথা পৌঁছে দিতে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া এবং পাঠ্যবইয়ে তার ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সীমান্তঘেঁষা এই এলাকাটিকে একটি নিরাপদ ও দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক পর্যটন জোন হিসেবে ঘোষণা করে নিরাপত্তা জোরদা করারও দাবি জানান বাসিন্দারা।

আবদুল কাদের জিলানী নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, রহস্যময় সুড়ঙ্গ দেখতে প্রতিনিয়ত দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন। শমসের গাজীর বিরত্বের ইতিহাস নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা উচিত। সুড়ঙ্গসহ স্থাপনাগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। যেন অনাগত প্রজন্ম ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে।

প্রতিকৃতিতে শমসের গাজী। ছবি: এশিয়া পোস্ট
প্রতিকৃতিতে শমসের গাজী। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঐতিহ্য গবেষক ও ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, বিপ্লবী শমসের গাজী আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার বীরত্ব ও দেশপ্রেম যুগ-যুগ ধরে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। অনেকে ফেনীর এই সাহসী সন্তানকে ভুলতে বসেছে, যা জাতির বড় ব্যর্থতা। আমি সরকারের কাছে জোর দাবি জানাব, যেন শমসের গাজীর ইতিহাস পাঠ্য বইতে সংযুক্ত করা হয়, যা তরুণদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।

এ বিষয়ে ফেনীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ মাহবুবুল করিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, শমসের গাজীর ইতিহাস আমাদের অমূল্য সম্পদ। তার রেখে যাওয়া ইতিহাস ও স্থাপনা রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে দ্রুত খোঁজ-খবর নেওয়া হবে।