logo

বিশ্ব ট্রমা দিবস/বাসের হঠাৎ ব্রেকে দৃষ্টিশক্তি হারান রাজীব, অর্থের সংকটে থেমে আছে চিকিৎসা

বাসের হঠাৎ ব্রেকে দৃষ্টিশক্তি হারান রাজীব, অর্থের সংকটে থেমে আছে চিকিৎসা
প্রকৌশলী ওবাইদুল হক রাজীব। পুরোনো ছবি

সাধারণ একটি বাস যাত্রা যে জীবনটাকে এভাবে বদলে দেবে, তা ভাবতেও পারেননি প্রকৌশলী ওবাইদুল হক রাজীব। গত জানুয়ারিতে বাগেরহাটের মোল্লাহাট থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে রাজীব পরিবহনের একটি বাসে উঠেছিলেন তিনি। যাত্রাপথে চালকের বেপরোয়া গতি ও আকস্মিক ব্রেকে বাসের ভেতরে ছিটকে পড়েন রাজীব। এতে মুখমণ্ডল ও মাথার একাধিক হাড় ভেঙে চিরতরে হারিয়ে গেছে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে হাসপাতালের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে আজ অর্থসংকটে থেমে আছে তার চিকিৎসা।

আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিশ্ব ট্রমা দিবস উপলক্ষ্যে এশিয়া পোস্টের কথা হয় খুলনার লবণচরার রাজীবের সঙ্গে। তার অভিজ্ঞতায় সামনে এসছে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার, জরুরি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কতটা জরুরি।

রাজীবের ভাষ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে বাগেরহাটের মোল্লাহাটের মাদ্রাসা ঘাট থেকে খুলনার লবণচরার উদ্দেশে রাজীব পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন তিনি। বাসটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৯৭৩১। যাত্রার শুরু থেকেই চালক অস্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং কিছুক্ষণ পরপর আকস্মিক ব্রেক করছিলেন।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি দেখে বাসের হেলপারকে ডেকে বলি চালককে ‘আস্তে চালাতে বলো’। কিন্তু হেলপার আমার কথায় বিরক্ত হয়। পরে রূপসা সেতুর মাঝামাঝি পৌঁছালে বাসটি নির্ধারিত গন্তব্যের আগেই যাত্রী ডাকতে শুরু করে। সে সময় হেলপার বা সুপার ভাইজারের ডাকে সাড়া দিয়ে আমি ইঞ্জিন কভারের কাছে যাওয়ার সময় চালক আবার আকস্মিক ব্রেক করে। সেই ব্রেকে আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসের সিড়ির ধাতব অ্যাঙ্গেলের ওপর পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পাই।

প্রকৌশলী রাজীব আরও বলেন, ওই আঘাতে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছি আমি। গত ৯ মাসে খুলনা থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ হয়ে উঠতে পারিনি। প্রয়োজন আরও অস্ত্রোপচার, কিন্তু অর্থসংকটে চিকিৎসা আটকে আছে।

রাজীবের দাবি, ওই আঘাতে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। বাম চোখেও গুরুতর আঘাত লাগে। মাথা, কপাল, নাক, দুই চোখের পেছন ও পাশের হাড় এবং মুখের ডান পাশের হাড় ভেঙে যায়।

এরপর শুরু হয় রাজীবের দীর্ঘ চিকিৎসাযুদ্ধ। প্রথমে খুলনা গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য পরে তাকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা ডেন্টাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন রাজীব।

তবে নয় মাস পেরিয়েও শেষ হয়নি চিকিৎসা। রাজীব জানান, বাম চোখের ওপর কপালের একটি অংশের হাড় অস্ত্রোপচার করে কেটে ফেলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেটি পুনঃস্থাপনের জন্য আরও অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। এছাড়া ম্যাক্সিলার অস্ত্রোপচারের পর তার নাক-মুখের পথ দিয়ে ব্রেন ফ্লুইড বা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড ঝরার সমস্যা দেখা দেয়। গত ১৪ জুলাই ও ২২ আগস্ট এ ধরনের জটিলতা আবারও দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এজন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হলেও অর্থসংকটে তা করাতে পারেননি রাজীব।

দীর্ঘদিন চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি। একদিকে দৃষ্টিশক্তি হারানোর বেদনা, অন্যদিকে অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার ব্যয় সব মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার।

ঘটনার পর বাসচালক ও হেলপারের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেছেন রাজীব। তার দাবি, বাসে পড়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর তাকে ঘটনাস্থলে রেখেই চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন চালক ও হেলপার। পরে দুই যাত্রীর বাধার কারণে তারা তা করতে পারেননি। হাসপাতালে নেওয়ার সময় ওই দুই যাত্রী চালক ও হেলপারকে সহযোগিতা করতে বললেও তারা রাজীবকে সাহায্য করেনি।

রাজীব পরিবহনের বিরুদ্ধে জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার (লিগ্যাল এইড) মাধ্যমে একটি মামলা চলছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত রাজীব পরিবহনের মহাখালী কাউন্টারে মোবাইল ফোনে কথা বলতে চাইলে তারা কল কেটে দেন।

তার অভিযোগ, রাজীব পরিবহনের রোড পারমিট জামালপুর থেকে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকা মহাসড়কের জন্য হলেও দীর্ঘদিন ধরে বাসটি জামালপুর-মুক্তাগাছা-ঢাকা রুটে চলাচল করছে। বেপরোয়া গতির কারণে এই পরিবহনের বাসে বহু মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে খুলনা জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল গফফার বিশ্বাস এশিয়া পোস্টকে বলেন, দুর্ঘটনা তো আর কেউ ইচ্ছা করে করে না। আমাদের চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি মানা হয় না। রাস্তাঘাটের অবস্থাও খারাপ। আমাদের রাস্তাগুলো যেভাবে তৈরি হওয়া দরকার ছিল, সেভাবে তৈরি হয়নি। রাস্তায় ইজিবাইক চলছে, এমনকি মহাসড়কেও ইজিবাইক চলাচল করছে। এছাড়া যেই-সেই গাড়িকে রোড পারমিট দেওয়া হচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাও ভালো নয়।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিকস ও সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. নজরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো মানুষ সড়ক পরিবহন আইন ও ট্রাফিক বিধিনিষেধ যথাযথভাবে মেনে চলে না। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা দিতে দেরি হলে রোগীর শারীরিক জটিলতা বাড়তে পারে। দুর্ঘটনায় আহতদের মৃত্যু ও স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমাতে দ্রুত উদ্ধার, সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

খুলনা জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক স্পেশালিস্ট ও ট্রমা সার্জন ডা. এস. কে. ইমরান আহমেদ বলেন, বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে অনেক মানুষ হতাহত হলে ট্রায়াজ (Triage) পদ্ধতিতে আহতদের আঘাতের ধরন ও জীবনহানির ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়। দুর্ঘটনাস্থল ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আহতদের অবস্থা মূল্যায়ন করে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা আহতদের অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন।

তিনি বলেন, একজন আহত রোগী হাসপাতালে এলে প্রথমেই দেখা হয়, তার এমন কোনো আঘাত আছে কি না, যার কারণে মৃত্যু হতে পারে। যেমন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া। এসব সমস্যার চিকিৎসা আগে দিয়ে মৃত্যুঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হয়। রোগী শঙ্কামুক্ত হওয়ার পর অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ডা. ইমরান আহমেদ বলেন, বড় দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ আহত হলে গুরুতর রোগীদের আগে চিকিৎসা দেওয়া জরুরি। কিন্তু এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাব রয়েছে। সামান্য কাটা-ছেঁড়ায় আক্রান্ত রোগীদের স্বজনদের ভিড়ে জরুরি চিকিৎসাপ্রয়োজন এমন রোগীরা সেবা পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন।

ট্রমাজনিত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্কে আঘাত, ফুসফুস ও হৃদ্‌যন্ত্রে গুরুতর আঘাত এবং হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়া মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এসব ঝুঁকি কমাতে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ চালক তৈরি, সড়কের উন্নয়ন, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ, নির্মাণকাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

হাসপাতালে জনবলসংকটের বিষয়টি তুলে ধরে এই ট্রমা সার্জন বলেন, জনবলসংকটের কারণে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

সড়ক দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) খুলনা আবির সিদ্দিকী শুভ্র। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুর্ঘটনাস্থলে যানজট, উৎসুক জনতার ভিড়, উদ্ধারকাজে সমন্বয়ের অভাব এবং দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ার কারণে জরুরি চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে সহায়তা, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নেও পুলিশ দায়িত্ব পালন করে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমাতে পুলিশের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিশ্ব ট্রমা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও প্রাণহানি কমানো। বিআরটিএ, খুলনা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, চালকদের দক্ষতা যাচাই এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে চালক, যাত্রী, পথচারী ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানাই।