হিলি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় দুই বাংলার মিলনমেলা

শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার হিলি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার দুই পাশে সৃষ্টি হয়েছে দুই বাংলার মানুষের এক আবেগঘন মিলনমেলা। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিনে বাংলাদেশ ও ভারতের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সীমান্তের দুই পাশে ভিড় জমান। কেউ এসেছেন দেবী দুর্গার প্রতিমা দেখতে, কেউবা দীর্ঘদিন ধরে ওপারে থাকা আত্মীয়স্বজনের একনজর দেখা পেতে। দুই দেশের ভূখণ্ডকে কাঁটাতারের বেড়া আলাদা করে রাখলেও ভাষা, সংস্কৃতি, ভালোবাসা ও আত্মীয়তার বন্ধন যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এই বিশেষ দিনে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকেই হিলি সীমান্তের চেকপোস্ট ও শূন্যরেখা-সংলগ্ন এলাকায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ নানা বয়সী মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে সীমান্ত এলাকায় আসেন।
একইভাবে ভারতের দিক থেকেও অনেক মানুষ সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান নেন। দুই দেশের মানুষের এমন উপস্থিতিতে সীমান্ত এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি দীর্ঘদিন দেখা না হওয়া স্বজনদের কাছে না পাওয়ার আক্ষেপও ফুটে ওঠে অনেকের চোখেমুখে।
সীমান্তের এপার-ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে ছিল এক অন্যরকম আবেগ। কেউ দূর থেকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান, কেউ মুঠোফোনে কথা বলে প্রিয়জনের খোঁজখবর নেন। আবার কেউ কাঁটাতারের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনকে একনজর দেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এত কাছাকাছি থেকেও কাছে যেতে না পারার আক্ষেপ তাদের মনে বারবার নাড়া দেয়। তবুও প্রিয়জনের মুখটি দেখতে পাওয়ার আনন্দে অনেকের মুখেই ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হিলি সীমান্তের দুই পাশে এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যাদের আত্মীয়স্বজন বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশে বিভক্ত হয়ে বসবাস করছেন। দেশভাগের পর থেকে ভূখণ্ডের বিভাজন তৈরি হলেও অনেক পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক আজও অটুট রয়েছে। সময়ের ব্যবধানে দূরত্ব বেড়েছে, বেড়েছে যাতায়াতের আনুষ্ঠানিকতা; কিন্তু একে অপরের প্রতি টান কমেনি। ভিসা, পাসপোর্ট ও সীমান্তসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে ইচ্ছা থাকলেও সহজে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয় না। তাই দুর্গাপূজার মতো বড় ধর্মীয় উৎসবের দিনে সীমান্তে এসে প্রিয়জনের একঝলক দেখা পাওয়ার চেষ্টা করেন তারা।
সীমান্তে আসা অভি বসাক বলেন, ওপারে আমাদের আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। অনেক দিন তাদের সঙ্গে দেখা হয় না। পূজার এই দিনে তাদের একনজর দেখার আশায় এখানে এসেছি। কাছে গিয়ে কথা বলতে পারি না, একসঙ্গে বসে আনন্দ ভাগাভাগি করারও সুযোগ নেই। তারপরও দূর থেকে তাদের দেখতে পেলে মনটা ভালো হয়ে যায়। দুই দেশে থাকলেও আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার বন্ধন একই রকম।
তিনি আরও বলেন, উৎসবের দিনে পরিবারের সবাইকে কাছে পেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সীমান্তের নিয়মের কারণে সব সময় তা সম্ভব হয় না। তাই দূর থেকে হলেও প্রিয়জনদের দেখতে পাওয়াটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের।
মৌমিতা সেন নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, দুর্গাপূজা আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। এই উৎসবকে ঘিরে সবার মধ্যেই আনন্দ থাকে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা থাকে। ওপারে আমাদের পরিচিত ও আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। তাদের সঙ্গে দেখা করার আশায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সীমান্তে এসেছি। কাঁটাতারের কারণে কাছে যেতে না পারার কষ্ট তো রয়েছেই, তবুও দূর থেকে তাদের দেখতে পেয়ে মনে হয় অন্তত কিছুটা হলেও মনের আশা পূরণ হয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, দুই পাশে দুটি দেশ হলেও মানুষের আবেগ তো আলাদা নয়। এপার বাংলার মানুষ যেমন পূজা উদ্যাপন করছেন, ওপার বাংলার মানুষও তেমনি আনন্দ করছেন। সবার মধ্যেই উৎসবের আনন্দ ও স্বজনদের প্রতি ভালোবাসা সমান।
সীমান্তে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী জানান, দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আত্মীয়স্বজন, পরিবার ও পরিচিতদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার একটি বড় উপলক্ষ। কিন্তু সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী অনেক মানুষের কাছে এই আনন্দ কিছুটা অপূর্ণ থেকে যায়। দীর্ঘদিন দেখা না হওয়া স্বজনদের খুব কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও স্পর্শ করতে না পারার কষ্ট তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর মতো আবেগঘন দিনে সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়ে ওঠে।
হাকিমপুর উপজেলার হিলি চেকপোস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাকারিয়া হোসেন জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে বৈধ পাসপোর্টধারীদের যাতায়াত স্বাভাবিক। শারদীয় দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমীর দিনে সীমান্তরেখা এক মিলনমেলায় পরিণত হয়; এতে দুই দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শূন্যরেখায় এসে মিলিত হন।
