logo

গণভোটের রায় অস্বীকার করে জনগণকে অপমান করেছে সরকার: জামায়াত আমির

গণভোটের রায় অস্বীকার করে জনগণকে অপমান করেছে সরকার: জামায়াত আমির
যশোরে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের পথসভায় বক্তব্য দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: এশিয়া পোস্ট

গণভোটের রায় অস্বীকার করে সরকার জনগণকে অপমান করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিন্তু সরকার সেই গণরায় অস্বীকার করেছে। জনগণ তাদের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এর জবাব দেবে। এখনো সময় আছে, শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে গণভোটের রায় মেনে নিন। অন্যথায় জনগণই তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে যশোর শহরের মুড়লী মোড়ে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এসময় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সাত দফা দাবি কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার ব্যক্তিগত দাবি নয়, এটি জনগণের দাবি। জনগণের পক্ষ থেকেই ১১ দলীয় ঐক্য এসব দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছে। গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। অথচ সরকার সেই গণরায় অস্বীকার করেছে। সংসদ নির্বাচনের রায় ছিনতাই করা হলেও গণভোটের রায় ছিনতাই করতে পারেনি। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে গণভোট মেনে নেওয়ার কথা বললেও ক্ষমতায় বসার পর সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে।

তিনি বলেন, আপনাদের রায়কে তারা অস্বীকার করেছে, আপনাদের অপমান করেছে। এর প্রতিশোধ জনগণ নেবে ইনশাআল্লাহ। জনগণ তাদের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমেই প্রতিশোধ নেবে।

সাত দফা দাবির মধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, এই দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই বাকি ছয়টি দাবি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। একটি ইনসাফপূর্ণ, বৈষম্যহীন ও যুবসমাজের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথম দফা দাবি সবার আগে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সময় আছে, সময় থাকতে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিন। সময় যদি চলে যায়, তাহলে কেউ আর আপনাদের দিকে ফিরে তাকাবে না।

সরকারের বিভিন্ন ধরনের কার্ড বিতরণ কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. শফিকুর রহমান। উপস্থিত জনতার কাছে তিনি জানতে চান, তাদের মধ্যে কারা এসব কার্ড পেয়েছেন। এসময় কেউ হাত না তোলায় তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি বাংলাদেশের জনগণ না?’ তিনি বলেন, এসব কার্ড জনগণের অর্থে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে সাধারণ মানুষ কেন তা পাচ্ছে না, কার্ডগুলো কোথায় যাচ্ছে— সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। কার্ড বিতরণে অনিয়মের ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, রাতের বেলা পুকুরপাড়ে কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে।

এর আগে বিশেষ অতিথি বক্তব্য বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে সরকার গাদ্দারি করছে, জনগণকে অসম্মান করছে। গণভোট অবৈধ হলে এ সরকার ও সংসদও বৈধ হতে পারে না। আমরা জুলাই বিপ্লবের প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট পুনর্ব্যক্ত করছি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে আসছি।

সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। তেল ও গ্যাস সংকটে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করায় দেশে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বেড়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার প্রচার করেছেন। অথচ ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই রায় অস্বীকার করা হচ্ছে। জনগণের সঙ্গে এমন আচরণের প্রতিবাদেই ১১ দল নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে নেমেছে। তিনি দ্রব্যমূল্য, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারি এবং সার, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কথা তুলে ধরে সরকারের আট মাসের শাসনামলের সমালোচনা করেন। কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের কর্মসূচির সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে জনগণ সরকারকে লাল কার্ড দেখাবে।

অন্যদিকে, পথসভায় বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে বলেন, বিরোধী দলকে বিকল্প সরকার হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারের অনিয়ম ও নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ থাকলে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। আপসকামিতার রাজনীতি দিয়ে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন সম্ভব নয়।

সরকারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তাহীনতা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দলীয়করণ ও কর্মসংস্থান সংকটের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, তরুণেরা পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাচ্ছেন না। দেশের মানুষ কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন চান। এসব সমস্যার সমাধান না হলে জনগণ আবার রাজপথে নামবে।

অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যা ও শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দেশে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস ও দলীয়করণ বন্ধ না হলে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান হবে। শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পথসভায় সভাপতিত্ব করেন যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের নায়েবে আমির হামিদ হোসেন আজাদ, যশোরের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য এবং ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।

এসময় উপস্থিত ছিলেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ, শার্শা আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমান, মণিরামপুর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক, কেশবপুর আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুক্তার আলী, যশোর জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মো. নুরুজ্জামান, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ আবু জাফর সিদ্দিকী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যশোরের সভাপতি মাওলানা বেলায়েত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মাসুম বিল্লাহ, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি গোলাম কুদ্দুস, বিশিষ্ট সমাজসেবক ও শিল্পপতি ভিপি আব্দুল কাদের, অধ্যাপক আবুল হাশিম রেজা, এনসিপির সদস্য সচিব মনিরুজ্জামান আজাদ, জেলা এলডিপির সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান রিপন, জেলা এবি পার্টির আহ্বায়ক ড. মো. ইয়ামিনুর রহমান, এলডিপির সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম মিলন, জেলা বিডিপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম, যশোর সদর উপজেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আশরাফ আলী, শহর জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা ইসমাইল হোসেন, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতি রাশেদুল ইসলাম, ছাত্রশিবিরের যশোর শহর সভাপতি ওবাইদুল্লাহ হুসাইন, জেলা পূর্ব শাখার সভাপতি মিনারুল ইসলাম, জেলা পশ্চিম শাখার সভাপতি ইসমাইল হোসেন এবং জেলা জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক খান মিফতাহুল অমিতসহ ১১ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।