logo

আপনারা এমপিদের পাত্তা দিচ্ছেন না কেন, ডিসিকে এমপি বেলাল

আপনারা এমপিদের পাত্তা দিচ্ছেন না কেন, ডিসিকে এমপি বেলাল
রংপুর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন এমপি মাহবুবুর রহমান বেলাল। ছবি : এশিয়া পোস্ট

রংপুর-৩ আসনের জামায়াত সমর্থিত সংসদ সদস্য (এমপি) মাহবুবুর রহমান বেলাল রংপুর জেলা প্রশাসককে (ডিসি) উদ্দেশ করে বলেছেন, আপনারা এমপিদের পাত্তা দিচ্ছেন না। হোয়াই? হোয়াই? কী ভেবেছেন আপনারা? আপনারা আসমান থেকে এসেছেন? মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছেন? উই আর দ্য সনস অব দিস ল্যান্ড সয়েল। আমাদের জনগণ ভোট দিয়েছে। আমাদের পাত্তা দেন না কেন? কেন? কেন?

রোববার (১১ অক্টোবর) রংপুর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স (পদমর্যাদাক্রম) না মানা, বিভিন্ন কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখা, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম এবং একটি দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে তিনি ডিসিকে উদ্দেশ করে এসব কথা বলেন।

জবাবে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, বড় পরিসরের এ ধরনের সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় শব্দচয়নে সবাইকে সতর্ক থাকা উচিত।

এর আগে রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে এ সভা শুরু হয়। জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সভাপতিত্বে সভায় রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিনসহ মহানগর ও জেলা পুলিশের কর্মকর্তা এবং জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মাহবুবুর রহমান বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। রাষ্ট্র নির্ধারিত পদমর্যাদাক্রম অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের সম্মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিদের জনগণের স্বার্থে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। আপনারা এমপিদের পাত্তা দিচ্ছেন না। হোয়াই? হোয়াই? কী ভেবেছেন আপনারা? আপনারা আসমান থেকে এসেছেন? মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছেন? উই আর দ্য সনস অব দিস ল্যান্ড সয়েল। আমাদের জনগণ ভোট দিয়েছে। আমাদের পাত্তা দেন না কেন? কেন? কেন?

জনগণের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলনে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা ভদ্রলোক। পাশাপাশি আমরা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধি। জনগণের ন্যায্য দাবিতে বাধ্য হয়ে আমাকে আন্দোলনে নামতে হবে। আমার মূল শক্তি হলো জনগণ।

সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এই সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কিছু ব্যবসায়ী ডিলারশিপ পাননি। অন্যদিকে দলীয় পরিচয়ের কারণে অভিজ্ঞতাহীন কিছু ব্যক্তি ডিলারশিপ পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, একটি সার ডিলারশিপের জন্য অনেক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী আবেদন করেছেন, সমস্ত শর্ত পূরণ হয়েছে। বাট সে পেল না। পেল কে? দলীয় পরিচয়ে একজন বিশেষ লোক, যার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, কোনো গোডাউন নেই, কোনো সলভেন্সি নেই। তারপরও সে কীভাবে পেল?

ডিলার নিয়োগে একই পরিবারের একাধিক সদস্য এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম আসার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন এবং জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

সংসদ সদস্য বলেন, সারের বিষয়ে একটি লজ্জাজনক, ন্যক্কারজনক দলীয়করণ হয়েছে। আমি এর তীব্র নিন্দা করছি। সব ডিলার একটি দল থেকে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হলেন কেন?

তবে ডিলার নিয়োগে অনিয়ম বা দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

জেলার বিভিন্ন সরকারি কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখার অভিযোগও তোলেন এমপি বেলাল। তার দাবি, অনেক কমিটিতে জনপ্রতিনিধিদের প্রতিনিধি রাখার বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। জেলায় অনেক কমিটি আছে। আপনারা জানেন, অনেক কমিটি। কিন্তু এমপির কয়জন প্রতিনিধি সেখানে আছেন? সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, এমপির প্রতিনিধি থাকবে। সেটাও নেই।’

তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত না করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে জনগণের মতামতের যথাযথ প্রতিফলন ঘটে না। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোতে বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি রাখার আহ্বান জানান।

সভায় সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার উপস্থিত না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন এমপি বেলাল। তার মতে, নগরীর আইনশৃঙ্খলা ও বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধির উপস্থিতি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সিটি নিয়ে আলোচনা হবে, আর সিটি প্রশাসক থাকবেন না, বা মেয়র থাকবেন না এটা তো হতে পারে না। তাঁরা আসবেন না কেন, আমি বুঝি না। আমার মাথায় ঢোকে না। এমপিরা যদি থাকতে পারেন, হোয়াই নট প্রশাসক, হোয়াই নট মেয়র? আমি বুঝি না। হোয়াই নট পুলিশ কমিশনার?’

এ সময় তিনি সভাটি পুনর্নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন।

প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে এমপি বেলাল বলেন, জনগণের দাবি উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে আন্দোলন হতে পারে। তিনি কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনাদের তামাশা আমরা দেখছি। আপনারা একটি দলের তেল মারছেন। কত তেল মারবেন?

তিনি আরও বলেন, আমাদের বাধ্য করবেন না থানায় ঘেরাও করার জন্য। আমাদের বাধ্য করবেন না ডিসি অফিস ঘেরাও করার জন্য।

আসন্ন দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপনের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানান এমপি বেলাল। তিনি পূজামণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, কোনো মহল যেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে পূজার পরিবেশ বিঘ্নিত করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে। এ সময় তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এ ছাড়া শ্যামা সুন্দরী খাল সংস্কার, যানজট নিরসন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার এবং ঢাকা কোচ স্ট্যান্ড শহরের বাইরে স্থানান্তরের বিষয়েও বক্তব্য দেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, বড় পরিসরের এ ধরনের সভায় বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে শব্দচয়নে সতর্ক থাকতে হবে। সরকারি কর্মকর্তারা যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন উল্লেখ করে তিনি পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে কথা বলার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, আমার মনে হয়, আমাদের সব সদস্যকেই শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্কভাবে কথা বলা দরকার। কারণ, এটি একটি জেলার সর্বোচ্চ ফোরাম। এখানে সব সরকারি কর্মকর্তা আছেন। তারা সবাই যোগ্যতার ভিত্তিতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পেয়েছেন।

ডিসি আরও বলেন, কাকে কীভাবে, কতটুকু বলব, সে ক্ষেত্রে আমাদের সবারই সম্মান বজায় রেখে কথা বলার সুযোগ আছে। বিশেষ করে শব্দচয়নের ক্ষেত্রে। আমরা কোন ভাষায়, কী শব্দ বলব, কোন জায়গায় বলব—এসব বিষয়ে আমাদের সবারই খেয়াল রাখা উচিত।