logo

চারজনের জায়গায় ৮, গাদাগাদি করে বেপরোয়া গতিতে মহাসড়কে ছুটছে অটোরিকশা

চারজনের জায়গায় ৮, গাদাগাদি করে বেপরোয়া গতিতে মহাসড়কে ছুটছে অটোরিকশা
মহাসড়কে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ছুটে চলছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

সামনের সরু আসনে চালকসহ তিনজন, পেছনে আরও তিনজন। কোলে শিশু থাকলে সেই সংখ্যা কখনো সাত, কখনো আটজনেও পৌঁছে যায়। ছোট্ট একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গাদাগাদি করে বসা এসব যাত্রীকে নিয়ে ছোট-বড় সড়ক থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত ছুটছেন চালকেরা। অথচ বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী, একটি সিএনজিতে চালকসহ সর্বোচ্চ চারজন চলাচল করতে পারেন। বাস্তবে সেই নিয়মের কোনো বালাই নেই জামালপুরে। অতিরিক্ত যাত্রী, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং আর সীমিত নজরদারির কারণে জামালপুরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা এখন পরিণত হয়েছে নিত্যদিনের ঝুঁকির বাহনে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, জামালপুরে নিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার হলেও বাইরের জেলাসহ প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। জেলা সদর থেকে উপজেলা ও গ্রামীণ সড়ক ছাড়িয়ে জামালপুর-ময়মনসিংহ ও জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও এসব হালকা যান অবাধে চলছে। বিশেষ করে জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ব্রহ্মপুত্র নদ ঘেঁষা আঁকাবাঁকা বাঁকগুলোতে বাস-ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

নিয়মে চার, বাস্তবে ছয়

বিআরটিএ জামালপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিয়ার) আনোয়ারুল কিবরিয়া দেওয়া তথ্য মতে, একটি অটোরিকশায় চালকসহ মোট চারজন চলাচল করতে পারেন। সামনে থাকবেন চালক, পেছনের আসনে বসবেন তিনজন।

কিন্তু জেলার প্রায় সব রুটেই দেখা যায় উল্টো চিত্র। যাত্রী বেশি পাওয়ার আশায় কিংবা দ্রুত গাড়ি পূর্ণ করতে গিয়ে চালকেরা অতিরিক্ত যাত্রী তুলছেন। যাত্রীরাও কম খরচে ও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এসব অটোরিকশায় উঠছেন।

অটোরিকশা স্ট্যান্ড। ছবি: এশিয়া পোস্ট
অটোরিকশা স্ট্যান্ড। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সদর উপজেলার রানাগাছা এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, একটা অটোরিকশায় কতজন মানুষ ওঠে, তার কোনো হিসাব নেই। ভেতরে জায়গা না থাকলেও সামনে ড্রাইভারসহ ৩ জন, পেছনে ৩ জন বসে। মহাসড়কে ওঠার পর বাস-ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে। দুর্ঘটনা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই ছোট গাড়ির যাত্রীরাই।

জামালপুর সদরের বাসিন্দা অন্তর বলেন, অটোরিকশার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দ্রুত যাওয়া যায়। মানুষও তাই বেশি ব্যবহার করে। ড্রাইভারসহ সবসময় ৬ জন করে যাওয়া হয়। এভাবে অনেক সময় মনে হয় মানুষ নয়, মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটলে বাঁচার সুযোগ খুব কম থাকে। আবার পেছনের থেকে সামনে জায়গা অনেক কম সেখানেও ৩ জন বসে।

রাসেল আহমেদ বলেন, ড্রাইভার দুই সাইডে দুইজন মানুষ বসলে সে কি স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালাতে পারে। অতিরিক্ত মানুষ তোলে তারা অতিরিক্ত ভাড়ার জন্য। কোনো তদারকি নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা হাইওয়ে রোডে এই সমস্ত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনা কিছুটা কমে আসবে।

গন্তব্যে আগে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা

স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ রুটে অটোরিকশাগুলো নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড থেকে ছেড়ে যায়। গাড়ি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে। আবার গন্তব্যে পৌঁছে দ্রুত স্ট্যান্ডে ফিরে সিরিয়ালে দাঁড়ায় এবং দিনে বেশি ট্রিপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং মহাসড়কে বাস-ট্রাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা অনেক রুটেই নিয়মিত চিত্র হয়ে উঠেছে।

চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামালপুরে দীর্ঘদিন ধরে একটি মাত্র সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নিতে হয়। গ্যাস নিতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় অনেকে সেই সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেশি ট্রিপ দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা।

অটোরিকশাচালক আব্দুর রহিম বলেন, দিনে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। গ্যাস নিতেও অনেক সময় নষ্ট হয়। তাই অনেক চালক বেশি ট্রিপ দেওয়ার চেষ্টা করে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

অটোরিকশাচালক আনোয়ার বলেন, সব দোষ চালকদের দিলে হবে না। যাত্রীও বেশি, গাড়ি কময়। আবার মহাসড়কে বাস আর ট্রাকের চাপ বেশি। ছোট গাড়ি হওয়ায় ঝুঁকি তো থাকেই। আমরা স্বাভাবিকভাবে গেলেও বড়ো গাড়ি এসে চাপ দেয়। ৫ জন করে চলাচল করা হয়। তখন যা ভাড়া তাই রাখা হয়। আবার দেখেন যদি ২ জন বা ৩ জন করে নিয়ে যাযই তাহলে ভাড়া বেশি হয়ে যাবে। তখন ৬০ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা, কেউ যাইতে চাবে না।

একের পর এক প্রাণহানি

সাম্প্রতিক সময়ে জামালপুর ও আশপাশের সড়কে অটোরিকশার দুর্ঘটনা একাধিক প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে। গত ২২ জুলাই রানাগাছা মুদিরমোড় এলাকায় বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত ও চারজন আহত হন। ৩১ আগস্ট সদর উপজেলার লাহিড়ীকান্দা এলাকায় বাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত হন চারজন। সর্বশেষ ২ অক্টোবর ময়মনসিংহের আকুয়া বাইপাস এলাকায় বাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষে ৭ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে জামালপুরের একই পরিবারের চারজন ছিলেন। স্থানীয়দের মতে, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, দ্রুতগতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।

জনবল সংকটে তদারকি

অটোরিকশার অনিয়ম ঠেকাতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট, চালকদের প্রশিক্ষণ, রোড শো, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিআরটিএ। তবে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ারুল কিবরিয়া বলেন, নিয়ম অনুযায়ী অটোরিকশার সামনে চালক থাকবেন, আর পেছনে তিনজন যাত্রী বসবেন। অর্থাৎ চালকসহ মোট চারজন চলাচল করতে পারবেন। আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। পেশাদার চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি রোড শো, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে সবসময় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। বিআরটিএ অফিস উপজেলা ভিত্তিক নয়, জেলা ভিত্তিক। মাত্র পাঁচজন জনবল দিয়ে পুরো জামালপুরের পরিবহন খাত তদারকি করতে হয়, যা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা এখনো অনিবন্ধিত। আবার অনেকের কাগজপত্রও হালনাগাদ করা নেই। শুধু বিআরটিএ একা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। পুলিশ যদি গাড়ি চেকিং বাড়ায়, তাহলে এসব যানবাহনও নিয়মের আওতায় আসবে। আমরা অভিযান চালাই, কিন্তু পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। আর দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় কারণ ওভারস্পিড। এর সঙ্গে ওভারটেকিংও বড় কারণ। জামালপুর ময়মনসিংহ সড়কে অনেক বাঁক রয়েছে, ফলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

জামালপুর জেলার ট্রাফিক পুলিশের প্রোসিকিউশন ইন্সপেক্টর-১ জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, আমরা এই বিষয়ে কন্টিনিউ কাজ করতেছি। অটোরিকশাগুলোর যেগুলোতে রেজিস্ট্রেশন নেই সেগুলো মামলা হচ্ছে, আটক হচ্ছে। আবার ওই যে পাঁচজন বা বেশি করে যাত্রী নিচ্ছে সে ব্যাপারেও আমাদের মামলা, জরিমানা চলমান আছে।

রাবেয়া খাতুন

সম্পাদনা

রাবেয়া খাতুন

সাব এডিটর | এশিয়া পোস্ট