
পাঁচ বছর আগে দুটি শালিকের ছানা বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বিরহলি গ্রামের সাদিকুল ইসলাম। খাঁচায় বন্দী না রেখে বাড়িতেই পাখি দুটিকে লালন-পালন শুরু করেন তিনি। নিয়মিত খাবার, নিরাপদ আশ্রয় ও মানুষের সান্নিধ্যে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে শালিক দুটি। এখন পরিবারের সদস্যদের মুখে শোনা বিভিন্ন শব্দ অনুকরণ করে মানুষের মতো কথা বলে পাখি দুটি। তাদের এমন আচরণ দেখতে ও কথা শুনতে ভিড় করেন আশপাশের মানুষ।
সাদিকুলের বাবা আবদুস সুবাজানের বাড়িতে প্রায় পাঁচ বছর ধরে রয়েছে শালিক দুটি। পরিবারের সদস্যরা আদর করে পাখি দুটির নাম দিয়েছেন ‘ময়না’। মানুষের সঙ্গে থাকতে থাকতে পরিবারের সদস্যদের মুখে শোনা কয়েকটি শব্দ অনুকরণ করতে শিখেছে তারা। কেউ ডাকলে কাছে আসে। খাবারের সময় বাড়ির আশপাশে ঘোরাঘুরি করে। কখনো উঠানে, কখনো সামনের দোকানে গিয়ে বসে। অনেক দূরে উড়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসে বাড়িতে।
সাদিকুলদের বাড়ির সামনে রবিউল ইসলামের চা-পিঁয়াজুর দোকান। সেখানে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে শালিক দুটির। দোকানে আসা ক্রেতারা তাদের খাবার দেন। গ্রামের মানুষও পাখি দুটির সঙ্গে কথা বলেন। কেউ কেউ নতুন শব্দ শেখানোর চেষ্টা করেন। শালিক দুটি মাঝেমধ্যে সেসব শব্দও অনুকরণ করে।
দোকানদার রবিউল ইসলাম বলেন, শালিক দুটি এখন শুধু সাদিকুলদের বাড়ির নয়, এলাকার মানুষের কাছেও পরিচিত। অনেকে পাখি দুটি দেখতে ও তাদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। কেউ কেউ কিনতে চান। তবে সাদিকুলের কথা, এত আদরের পাখি কি বিক্রি করা যায়!
প্রতিবেশী আকাশ আলী বলেন, আমি দোকানে গেলে পাখি দুটি সেখানে চলে আসে। তাদের খাবার দিই। পাখি দুটি কথা বলতে পারে শুনে খুব ভালো লাগে।
সাথী আক্তার নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, আমি প্রায়ই পাখি দুটি দেখতে আসি। শুধু আমি নই, আশপাশের অনেকেই তাদের দেখতে আসেন। তাদের সঙ্গে কথা বলেন, খাবার খাওয়ান। পাখি দুটি মানুষের মতো কাছে আসে, কথা বলে। পাখি যে এত সুন্দরভাবে পোষ মানে, এই পাখি দুটি না দেখলে বুঝতাম না।
সাদিকুলের মা সিদ্দিকা বেগম বলেন, আমার ছেলে পাঁচ বছর ধরে পাখি দুটি লালন-পালন করছে। নিয়মিত খাবার দেয়, গোসল করিয়ে দেয়। পাশের দোকানেও অনেকে তাদের খাবার দেন, কথা বলেন। আমি ‘ময়না’ বলে ডাকলে পাখি দুটি চলে আসে। তারা অনেক কথা শিখেছে। সাদিক, মা, বাবা, ভাই, ভাবি ও আল্লাহ এমন শব্দ বলে সব সময়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তারা মুরগির ডাকও অনুকরণ করে।
সাদিকুলের বাবা আবদুস সুবাজান বলেন, পাখি দুটি এখন আমাদের পরিবারের সদস্য। পাঁচ বছর ধরে লালন-পালন করতে করতে তাদের প্রতি মায়া জন্মেছে। একদিন না দেখলে ভালো লাগে না। তারা খুব সুন্দর ও সুমধুর স্বরে কথা বলে। বাড়িতে এলে আমার ছেলের নাম ধরে ডাকে। ছেলে বাড়িতে না থাকলে মা, বাবা বলে ডাকতে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, বাড়িতে অপরিচিত কেউ এলে কুটুম, কুটুম বলে ডাকতে থাকে। আমরা যত দিন বেঁচে থাকি, পাখি দুটি যেন আমাদের সঙ্গে থাকে, এটাই কামনা।
পাখি দুটির মালিক সাদিকুল ইসলাম বলেন, পাঁচ বছর আগে যখন পাখি দুটি বাড়িতে নিয়ে আসি, তখন অনেক ছোট ছিল। ধীরে ধীরে লালন-পালন করে বড় করেছি। এখন তাদের প্রতি মায়া জন্মে গেছে। তারাও আমাদের ছেড়ে কোথাও যায় না। পাখি দুটির জন্য বাড়িতে আলাদা বাসা তৈরি করে দিয়েছি। কোথাও উড়ে গেলেও স্থায়ীভাবে সেখানে থাকে না। খাবারের সময় বাড়ির আশপাশেই ঘোরাঘুরি করে, নানা রকম শব্দ করে। আশপাশের অনেক মানুষ তাদের দেখতে আসেন, খাবার দেন ও কথা বলেন। এসব দেখে ভালো লাগে।
পীরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পাখির গলায় মানুষের স্বরযন্ত্রের মতো ‘সিরিংক্স’ নামের একটি অঙ্গ রয়েছে। এর সাহায্যে তারা বিভিন্ন সুর ও শব্দ তৈরি করতে পারে। শালিক মানুষের কথা ও আশপাশের পরিবেশের শব্দ শুনে তা মনে রাখতে এবং অনুকরণ করতে পারে। তবে মানুষের মতো শব্দের অর্থ বুঝে তারা কথা বলে না বরং শোনা শব্দের পুনরাবৃত্তি করে। পাখি দুটিকে নিয়মিত তদারক করা হবে বলেও জানান তিনি।


