logo

মাদারীপুর/খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় মৃত-প্রবাসীর নাম, বঞ্চিত দরিদ্ররা

রাকিব হাসান
মাদারীপুর
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় মৃত-প্রবাসীর নাম, বঞ্চিত দরিদ্ররা
শিবচর খাদ্য অফিস। ছবি : এশিয়া পোস্ট

৩০ কেজি চালের দাম ৪৫০ টাকা। হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির এই চাল অনেক পরিবারের খাবারের বড় ভরসা। বাজারদরের চাপে থাকা পরিবারগুলোর জন্য প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে চাল পাওয়ার এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নে এই কর্মসূচির সুবিধাভোগীর তালিকা ও চাল বিতরণ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, সুবিধাভোগীর তালিকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম রয়েছে। কোনো কোনো পরিবারের চারজন পর্যন্ত কার্ড পেয়েছেন। তালিকায় সৌদি আরবপ্রবাসী এবং মৃত ব্যক্তির নামও রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। অন্যদিকে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় অনেক পরিবার চাল পাচ্ছে না। তাদের নামে বরাদ্দ করা চাল অন্য কেউ তুলে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শুধু সুবিধাভোগীর তালিকা নয়, ডিলার নিয়োগ ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শুরুতে তানিয়া আক্তার নামের একজনকে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও পরে তার নিয়োগ স্থগিত করা হয়। এরপর কী প্রক্রিয়ায় এবং কার সিদ্ধান্তে বেশির ভাগ মাসে খলিল নামের একজনকে দিয়ে চাল বিতরণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্থানীয়দের কাছে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।

এসব অভিযোগের মধ্যে শিবচর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তাদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও কথিত ডিলারের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে প্রকৃত হতদরিদ্রদের বাদ দিয়ে তালিকায় অনিয়ম করা হয়েছে এবং বরাদ্দের চাল আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রথম ডিলার তানিয়া সুবিধা দিতে না পারায় তার নিয়োগ স্থগিত করা হয় এবং পরে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা খলিল নামের একজনকে দিয়ে মাসের পর মাস চাল বিতরণের দায়িত্ব দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিবচর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা খাদ্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চরজানাজাত ইউনিয়নে আগস্ট মাসে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় মোট ৯০০ জন নারী-পুরুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৪৮৭ জন এবং নারী ৪১৩ জন। ওই মাসে তাদের জন্য ৫৩২ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

তবে সরকারি হিসাবের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে সুবিধাভোগীদের একটি অংশ চাল না পাওয়ার অভিযোগ করায় পুরো বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

চরজানাজাত ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহিদা বেগমের স্বামী সাইদ বেপারী দুই বছর আগে মারা গেছেন। কিন্তু খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় এখনও তার নাম রয়েছে বলে অভিযোগ। ডিলার ও তালিকাকারীদের তথ্য অনুযায়ী, সবাইকে চাল দেওয়া হয়েছে। তাহলে সাইদ ব্যাপারীর নামে বরাদ্দ করা চাল কোথায় গেল এমন প্রশ্ন শাহিদা বেগমের।

তিনি বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় নাম থাকলেও তিনি চাল পাচ্ছেন না। তার মতো লিটন ব্যাপারী, সালমা, রুবেল মিয়া ও মহসিন ব্যাপারীও চাল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের অর্ধশতাধিক পরিবার চাল পায়নি।

একই পরিবারের চারজনের নামে কার্ড

চরজানাজাত ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে কার্ড থাকার অভিযোগকে ঘিরে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একই পরিবারের একাধিক ভাইয়ের নামে কার্ড রয়েছে। কোনো কোনো পরিবারের চারজন পর্যন্ত এই সুবিধা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে বর্তমানে দুজন সুবিধা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের একটি অংশ তালিকার বাইরে থেকে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি এই কর্মসূচির সুবিধা পরিবারভিত্তিক হওয়ায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে কার্ড থাকার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মইজুদ্দিন উকিলকান্দি গ্রামের দুই ভাই শহিদুল ও সোহেল মিয়া দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে থাকেন। তাদের নামেও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড রয়েছে।

তবে তাদের মা রুমি বেগমের অভিযোগ, আট-নয় মাস ধরে তারা চাল পাচ্ছেন না। ছেলেরা বিদেশে থাকলেও তাদের নামে তালিকায় চালের কার্ড রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। কিন্তু সেই চাল কারা নিয়ে যাচ্ছেন, তা তিনি জানেন না।

রুমি বেগম বলেন, আমরা দীর্ঘ আট-নয় মাস ধরে চাল পাই না। আমার ছেলেরা বিদেশ থাকে। শুনছি, আমাদের ছেলের নামে চালের কার্ড আছে তালিকায়। বাপুরে, কারা যেন চাল নিয়ে যায়, আমরা জানি না।

এদিকে সাইদ ব্যাপারীসহ কয়েকজন ব্যক্তি কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তাদের নামও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ। তবে তাদের নামে বরাদ্দ করা চাল কারা নিচ্ছেন, তা তাদের পরিবার জানে না।

সাইদ ব্যাপারীর স্ত্রী শাহিদা বেগম বলেন, আমার ছেলে সন্তান নিয়ে আমরা অনেক কষ্টে আছি। চলতে-ফিরতে কষ্ট হয়। আমি অসুস্থ মানুষ, ছোট ছেলে নিয়ে চলতে আমাগো অনেক কষ্ট হইতেছে। ন্যায্য মূল্যে চাল দিয়েছিল, সেই চাল দিয়ে মোটামুটি সংসার ভালোই চলতো। আমি স্বামী মরে যাওয়ার পর সেই চাল আর আমরা পাই না। সেই চাল যেন কারা নিয়ে যায়। এই চালগুলো যদি আমাদের দিত, তাহলে সংসার চলত ভালো। চাল কিনে খাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব না।

৬ নম্বর ওয়ার্ডের জাবেদ আলী মাদবরেরকান্দির বাসিন্দা দেলোয়ার বেপারীও এই কর্মসূচির চাল পান। তার পরিবারের দুই মেয়ে রুমা ও সুমা এবং এক আত্মীয়ও চাল পেতেন। তবে বর্তমানে দেলোয়ার ও তার আত্মীয় চাল পেলেও রুমা কয়েক মাস ধরে চাল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেলোয়ার ব্যাপারী বলেন, চেয়ারম্যানকে পাইলে আমার চাল দেওয়াই লাগতো। যেহেতু চেয়ারম্যান নাই, এ কারণে আমি কার কাছে গিয়ে বলব? এখন তো সব নেতারা করে।

একই পরিবারের চারজন কীভাবে চাল পেলেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকায় মাদবর সালিশি করে, এই কারণে আমাকে দিয়েছে।

অসুস্থ রুবেল মিয়া বলেন, তার ঘরে দুই দিন ধরে চাল নেই। তিনি যে টাকা আয় করেন, তা ওষুধ কিনতেই চলে যায়। সংসার চালানোর মতো অর্থ তার কাছে নেই। সরকারি চাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি।

রুবেল জানান, এর আগেও কয়েক মাস তিনি চাল পাননি। তার অভিযোগ, সরকারিভাবে তাকে নিয়মিত চাল দেওয়া হলে পরিবার নিয়ে চলতে পারতেন। তালিকায় তার নাম থাকলেও তার বরাদ্দের চাল অন্য একজন তুলে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সরকারের কাছে নিজের বরাদ্দের চাল পাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন রুবেল মিয়া।

অন্যদিকে সালমা বেগমের স্বামীও মারা গেছেন। স্বামীর নামে কার্ড থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি চাল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। তিন সন্তান নিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন তিনি। তার বরাদ্দের চালও অন্য একজন তুলে নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

খাদ্য কর্মকর্তা ও ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিলার ও খাদ্য কর্মকর্তার অবহেলায় প্রকৃত দরিদ্ররা চাল থেকে বঞ্চিত। প্রকৃত অসহায়দের চাল না দিয়ে সেগুলো আত্মসাৎ করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আমরা ডিলার ও খাদ্য কর্মকর্তার বিচার চাই।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে শিবচর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

চরজানাজাত ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোতালেব মেম্বার বলেন, যদি এরকম কেউ না পেয়ে থাকে, আমাদের কাছে বললে আমরা সেটা দেখব।

চাল বিতরণকারী ডিলার খলিলুর নিরভল বলেন, তালিকা করেছে খাদ্য কর্মকর্তা, ইউপি মেম্বার ও চেয়ারম্যানেরা। এ বিষয়ে আমি জানি না।

মিল মালিক ওবাইদুর রহমান বলেন, আমাকে যেভাবে তালিকা দেওয়া হয়েছে, আমি সেভাবেই এখান থেকে চাল পাঠিয়েছি।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বিতরণ কার্যক্রম তদারকির জন্য চরজানাজাত ইউনিয়নে ট্যাগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অজয় দাস। তবে তার মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে অজয় দাস বলেন, আমি শুক্রবার একদিন শুধু ভিজিট করতে পেরেছি।

শিবচর উপজেলার খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা জাকির হোসাইন বলেন, এসব তথ্য উপজেলা কর্মকর্তার কাছে আছে, আমার কাছে নেই।

চরজানাজাত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম রায়হান সরকারের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে কার্ড আছে কি না, প্রবাসী বা মৃত ব্যক্তির নামে কার্ড রয়েছে কি না, জনপ্রতিনিধি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কীভাবে তালিকায় এসেছেন, কতজন কার্ডধারী চাল উত্তোলন করেছেন এবং ডিলার নিয়োগ ও পরিবর্তনে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে—এসব তথ্য সরকারি রেকর্ডে থাকার কথা।

তবে এসব বিষয়ে চরজানাজাত ইউনিয়নের ইউপি সচিব আবদুল হালিম কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এসব দায়িত্ব ডিলার ও খাদ্য কর্মকর্তাদের। আমাদের না। আপনারা তাদের কাছে গেলে তথ্য ভালো পাবেন।

মাদারীপুর জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন বলেন, যদি কেউ চাল বিতরণে অনিয়ম করে থাকে, তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।