logo
Advertisement

সাদা মাছে লোকসান, কৈ চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন বিপ্লবের

এশিয়া পোস্ট নিউজ,বাগেরহাট
সাদা মাছে লোকসান, কৈ চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন বিপ্লবের
ঘেরে মাছের খাবার ও পানির যত্ন নিচ্ছেন মৎস্য চাষি বিপ্লব দেবনাথ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শুভদিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর শুভদিয়া গ্রামের মৎস্যচাষি বিপ্লব দেবনাথ। একসময় সাদা মাছ চাষ করলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ না পাওয়ায় চার বছর আগে শুরু করেন হাইব্রিড থাই কৈ মাছের চাষ। এরপর থেকে কৈ মাছই হয়ে উঠেছে তার স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম প্রধান ভরসা।

Advertisement

বর্তমানে প্রায় ২০ শতক জমির একটি ঘেরে ৪০ হাজার কৈ মাছ চাষ করছেন বিপ্লব। মাছগুলোর বয়স আড়াই মাসের বেশি। আর প্রায় এক মাস পর মাছগুলো বাজারজাত করার উপযোগী হবে বলে জানান তিনি। বর্তমানে প্রতি কেজিতে ১২ থেকে ১৩টি মাছ হচ্ছে। ৮ থেকে ১০টিতে কেজি হলে তা বাজারজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

বিপ্লব দেবনাথ বলেন, সাড়ে তিন মাসের একটি চাষচক্রে তার প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাছের খাবার, ওষুধ, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য পরিচর্যার খরচ। সবকিছু অনুকূলে থাকলে এ চাষ থেকে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। তার ঘেরে প্রায় ১০০ মণ মাছ উৎপাদন হতে পারে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মাছ চাষ করছি। চার বছর হলো কৈ মাছ চাষ শুরু করেছি। কৈ মাছ চাষে খরচ ও পরিশ্রম দুটোই বেশি। মাটি কাটা, নেট দেওয়া, পানি দেওয়া, খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে মাছের পরিচর্যা—সবকিছুই আমাকে একাই করতে হয়।

তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এই চাষি। তিনি জানান, বর্তমানে কৈ মাছের বাজারদর প্রতি মণ প্রায় ৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে মাছের খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। শুরুতে এক বস্তা খাবারের দাম ছিল প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা; বর্তমানে একই খাবার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২৫০ থেকে ২ হাজার ৩৭৫ টাকায়।

বিপ্লব দেবনাথ বলেন, খাবারের দাম যদি প্রতি কেজিতে চার টাকা করেও কমত, তাহলে আমাদের মতো চাষিরা কিছুটা স্বস্তি পেতেন। বিদ্যুতের সমস্যাও আছে। তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে এক ঘণ্টা থাকে না—এভাবে চললে মাছ চাষে ঝুঁকি বাড়ে। কৈ মাছের জন্য নিয়মিত পানি দিতে হয়। পানি ঠিকমতো না পেলে গ্যাস তৈরি হয়ে মাছ মারা যেতে পারে।

কৈ মাছ চাষে মিষ্টি পানির গুরুত্বের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ঘেরে সর্বনিম্ন চার ফুট থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ ফুট পানি রাখা ভালো। বাইরে থেকে পানি দেওয়ার সুযোগ না থাকলে বোরিং করে পানি সরবরাহ করা যায়। সঠিকভাবে পানি ও মাছের পরিচর্যা করতে পারলে কৈ মাছ চাষ লাভজনক হতে পারে।

নিজের সাফল্য দেখে অন্যদেরও কৈ মাছ চাষে আগ্রহী করতে চান বিপ্লব। তিনি বলেন, আমি চাই, আমাকে দেখে আরও অনেকেই কৈ মাছ চাষ শুরু করুক। দেশের মাছের ঘাটতি পূরণে আমরা ভূমিকা রাখতে পারি। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু নজর দেয়—খাবারের দাম কমানো, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা আরও ভালোভাবে মাছ উৎপাদন করতে পারব। মাছে-ভাতে বাঙালি—এই পরিচয় ধরে রাখতে আমরাও অবদান রাখতে চাই।

স্থানীয় বাসিন্দা রুম্মান মাহমুদ শৈশব বলেন, বিপ্লব দেবনাথ দীর্ঘদিন ধরে মাছ চাষ করছেন। আগে সাদা মাছ চাষ করলেও এখন কৈ মাছ চাষ করে ভালো করার চেষ্টা করছেন। তার মতো উদ্যোক্তারা যদি সরকারি সহযোগিতা পান, তাহলে এলাকায় আরও মানুষ মাছ চাষে আগ্রহী হবে।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা অনুপ কুমার দাস বলেন, হাইব্রিড থাই কৈ মাছ চাষ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তবে খাবার, বিদ্যুৎ ও পানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাষিদের লাভ কমে যাচ্ছে। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বাড়ানো হলে কৈ মাছের উৎপাদন আরও বাড়বে।

ফকিরহাট উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, কৈ মাছ চাষ লাভজনক হলেও এর জন্য পানির গুণগত মান, সঠিক ঘনত্ব, মানসম্মত খাবার ও নিয়মিত পরিচর্যা জরুরি। সঠিক নিয়ম মেনে চাষ করলে কৈ মাছ থেকে ভালো উৎপাদন ও আয় করা সম্ভব। বিপ্লব দেবনাথের মতো চাষিরা আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মাছের উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় মৎস্য চাষিদের মতে, কৈ মাছের চাষ শুধু মাছের উৎপাদনই বাড়াচ্ছে না, গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতেও ভূমিকা রাখছে। তবে উৎপাদন খরচ কমানো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, পর্যাপ্ত পানি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে কৈ মাছ চাষ আরও লাভজনক ও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে।

২৫ বছরের মাছ চাষের অভিজ্ঞতা আর চার বছরের কৈ মাছ চাষের পথচলায় নতুন স্বপ্ন দেখছেন বিপ্লব দেবনাথ। তার আশা, সরকারি সহযোগিতা ও অনুকূল পরিবেশ পেলে কৈ মাছের চাষ শুধু তার নিজের স্বাবলম্বিতার পথই সুগম করবে না, এলাকার আরও অনেক মানুষকে মাছ চাষে উৎসাহিত করবে।