logo

মেঘনায় বাপ-দাদার ভিটা, জাগা চরে প্রভাবশালীদের থাবা

মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল
নোয়াখালী
মেঘনায় বাপ-দাদার ভিটা, জাগা চরে প্রভাবশালীদের থাবা
মেঘনার বুকে জেগে উঠা নতুন চর দখলে নিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ঝুপড়ি ঘর। ছবি : এশিয়া পোস্ট

একপাশে সর্বগ্রাসী মেঘনার করাল গ্রাস, অন্যপাশে নতুন চরে ভূমিখেকোদের লোলুপ দৃষ্টি—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দিশেহারা নোয়াখালীর দক্ষিণ উপকূলের হাজারো মানুষ। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ও সাজানো সংসার নদীতে তলিয়ে যাওয়ার পর যখন মেঘনার বুকেই নতুন জমি জাগে, তখনো সেই জমিতে ঠাঁই হয় না তাদের। নতুন চরের দখল চলে যায় প্রভাবশালীদের হাতে, আর সর্বহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাস জমা হয় বেড়িবাঁধের ধুলাবালুতে।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) হিসাব অনুযায়ী, গত ৫৪ বছরে নোয়াখালীতে নদীভাঙনে প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি বিলীন হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে জেগে উঠেছে প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি। অর্থাৎ হারানো ভূমির তুলনায় নতুন করে জেগে ওঠা ভূমির পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ। তবে নতুন চর জাগার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনকবলিত মানুষের পুনর্বাসনের কোনো নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো অনেক মানুষ এক টুকরো জমির আশায় কখনো সরকারি দপ্তর, আবার কখনো স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। বছরের পর বছর এভাবে ঘুরেও অনেকে স্থায়ী বসতির ব্যবস্থা করতে পারছেন না।

হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর ভূমিহীন বাজার ছিল ওই এলাকার অন্যতম বড় ব্যবসাকেন্দ্র। স্থানীয় ব্যবসায়ী মমিন ভান্ডারি (৭০) এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাজারটিতে পাঁচ শতাধিক দোকান ছিল। বিদ্যুৎ ও পাকা সড়কের যোগাযোগ থাকায় দূর-দূরান্তের মানুষ এখানে কেনাকাটা করতে আসতেন। তবে নদীভাঙনে বাজারটির অর্ধেকের বেশি অংশ বিলীন হয়ে গেছে। অনেক ব্যবসায়ী শেষ সম্বল দোকানঘরটিও সরিয়ে নিতে পারেননি। কেউ কেউ যতটুকু সম্ভব খুলে নিয়ে গেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চলতি বছর একই এলাকার থানারহাট বাজারও নদীতে বিলীন হয়েছে। বাজার ও বেড়িবাঁধের অংশ হারিয়ে যাওয়ায় জোয়ারের পানি এখন দ্রুত উত্তর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে সুবর্ণচরের সোলেমান বাজারসহ আশপাশের এলাকায় নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আতঙ্কে রয়েছেন ওই এলাকার হাজারো মানুষ।

সুবর্ণচরের সোলেমান বাজারসহ আশপাশের এলাকায় নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট
সুবর্ণচরের সোলেমান বাজারসহ আশপাশের এলাকায় নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সুবর্ণচরের চরক্লার্ক ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশেও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ হেমায়েতপুরের আংশিক এলাকা, চর বায়েজিদ, চর খন্দকার, আলেমপুর, সৈয়দপুর, চর নোমান সমাজ ও চর মোজাম্মেলসহ কয়েকটি এলাকায় বসতি ও ফসলিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। এসব এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ও নদী নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশও ভাঙনের মুখে পড়েছে।

ভাঙনের শিকার হয়েছে চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের (সিডিএসপি) আওতাধীন হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়ন এবং সুবর্ণচর উপজেলার পূর্ব চরবাটার প্রায় ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। নদীগর্ভে গেছে বন বিভাগের রোপণ করা বিভিন্ন জাতের গাছও। ফলে ভাঙনের প্রভাব শুধু মানুষের বসতভিটায় সীমাবদ্ধ নেই; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি, যোগাযোগব্যবস্থা ও নদী নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামোও।

নোয়াখালী উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি আব্দুল বারী বাবলু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভাঙা-গড়া প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ নতুন করে জেগে ওঠা চরে আগের জমি ও জীবিকা ফিরে পান না। নতুন চর জাগার পর তা রাষ্ট্রীয় আওতায় নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। নদীভাঙনে একটি পরিবার যখন ভিটা হারায়, তখন শুধু বসতভিটাই নয়, তাদের সম্পদ, পেশা ও সামাজিক অবস্থানও একসঙ্গে হারিয়ে যায়।

চরক্লার্ক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল বাশার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভাঙনের বিষয়টি উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. শাহজাহানকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। কয়েক দিন আগে পানিসম্পদমন্ত্রী ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এরপর প্রাথমিকভাবে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের জন্য আলাদা কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেই। ভাঙনে কত মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছেন, তারও কোনো তালিকা করা হচ্ছে না। ঘরবাড়ি ও জমি হারানো মানুষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকিব ওসমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, মোহাম্মদপুর ও চরক্লার্ক ইউনিয়নের ভাঙনের বিষয়টি তাদের জানা আছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড একাধিকবার সেখানে জরিপ করেছে। তবে নদীভাঙনে এ পর্যন্ত কত পরিবার গৃহহীন হয়েছে, তার কোনো তালিকা করা হয়নি।

এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও সরকারি সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।