আদালতের হস্তক্ষেপে বাড়ি ফিরলেন শতবর্ষী তছিম উদ্দিন

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, চোখে জল আর বুকভরা ক্ষোভ নিয়ে কিছুদিন আগেও যিনি বলেছিলেন ‘নিজেকে পিতা ভাবতে লজ্জা হচ্ছে’ সেই শতবর্ষী তছিম উদ্দিন অবশেষে ফিরেছেন তার একমাত্র ছেলের কাছেই। এশিয়া পোষ্টে সংবাদ প্রকাশের পর আদালতের মানবিক হস্তক্ষেপ এবং পাবনা সদর থানা পুলিশের তৎপরতায় অবসান ঘটেছে এক অসহায় বাবার মানবেতর জীবনের।
রোববার (৩১ মে) রাতে পাবনা সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে, শনিবার (৩০ মে) আদালতের হস্তক্ষেপে বৃদ্ধকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
অসহায় তছিম উদ্দিন প্রামানিকের বাড়ি পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের ষাটগাছা গ্রামে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে এক সন্তান নিয়েই ছিল তার ছোট্ট পরিবার। ছেলের থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ঠাঁই হয় মালিগাছা ইউনিয়নের খন্দকার পাড়ার অসহায় রেজাউল-স্ত্রী দম্পতির বাড়িতে। নিজেদের ছোট্ট ঘরেই তারা আশ্রয় দিয়েছিলেন এই অসহায় বৃদ্ধকে।
জানা গেছে, এশিয়া পোস্টের সংবাদটি নজরে আসে পাবনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মতিউর রহমানের। তিনি তার সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন এবং আদালতে একটি মিস মামলা দায়ের করেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ও ১৫৬ (৩) ধারা মোতাবেক পাবনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আর্থিক সহায়তা ও অন্যান্য নির্দেশ দেন। সদর থানার ওসি তারিকুল ইসলামকে ঘটনার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, ঈদের দিন রাতে গয়েশপুর ইউনিয়ন থেকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয় ছেলে রায়হানকে। কিন্তু পরদিন সকালে থানায় এসে যখন বৃদ্ধ বাবা জানতে পারেন তার ছেলেকে পুলিশ ধরে এনেছে, তখন অতীতের সব ক্ষোভ ভুলে ‘বাজান, বাজান’ বলে চিৎকার করে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
ঈদের পরের দিন তুমুল ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই বাবা ও ছেলেকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানিতে আদালত রায় দেন, প্রতি মাসে বাবাকে ২৫০০ টাকা ভরণপোষণ দিতে হবে, নিয়মিত দেখাশোনা করতে হবে এবং বাবা যখনই চাইবেন তাকে সসম্মানে নিজের কাছে রাখতে হবে। এই শর্ত সাপেক্ষে জামিন দেন। পরবর্তীতে আদেশের জন্য আগামী ৩০ জুলাই ধার্য করা হয়। এদিকে আদালতের কাজ শেষ হতেই যখন বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন দেখা যায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সেই ছেলেই পরম মমতায় শতবর্ষী বাবাকে কোলে তুলে নিয়ে অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসেন।
এ বিষয়ে থানার পাবনা থানার ওসি তারিকুল ইসলাম বলেন, আমরা আদালতের নির্দেশে ছেলেকে নিয়ে আসি। কিন্তু থানায় বাবা-ছেলের যে মিলন আমরা দেখেছি, তা সত্যিই আমাদের আবেগাপ্লুত করেছে। রক্তের টান যে কতটা শক্তিশালী, তা এই পরিবারটি প্রমাণ করেছে। তাকে আমরা বাড়িতে দিয়ে আসছি। এখন আর অন্যের বাড়িতে থাকতে হবে না। ছেলেও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। ভবিষ্যতে আর এমন হবে না বলে অঙ্গীকার করেন।
