logo

একসময় মাসে আয় ছিল ৩০ হাজার, এখন ৩ হাজারে চালাতে হয় সংসার

শেখ সোহেল
বাগেরহাট
একসময় মাসে আয় ছিল ৩০ হাজার, এখন ৩ হাজারে চালাতে হয় সংসার
‘হৃদয় বাদ্য নিকেতন’ নামের দোকানের বিষ্ণুপদ দাস। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একসময় তার দোকানে কাজ করতেন ছয়-সাতজন কারিগর। দিন-রাত চলত বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতের কাজ। মাসে আয় হতো ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। সেই আয়েই স্বচ্ছন্দে চলত সংসার। সময়ের পালাবদলে আজ সেই দোকানে তিনি একাই। কখনো সারা দিনেও জোটে না একটি কাজ। মাস শেষে খুব কষ্টে আয় দাঁড়ায় তিন থেকে ১০ হাজার টাকায়। কোনো কোনো মাসে বিক্রিও হয় মাত্র কয়েক হাজার টাকার।

এভাবেই বাগেরহাট পৌরসভার স্টেডিয়ামসংলগ্ন ‘হৃদয় বাদ্য নিকেতন’ নামের ছোট্ট দোকানটিতে তিন পুরুষের পেশা আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বিষ্ণুপদ দাস। দাদুর হাত ধরে শুরু হওয়া এই ব্যবসা বাবার পর নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। স্বাধীনতার আগে থেকে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী এই দোকানটিই এখন তার চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র ভরসা।

বিষ্ণুপদ দাসের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় মৃদঙ্গ, তবলা, ঢাক, ঢোলক, একতারা, দোতারা, গিটারসহ নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র। পুরোনো বাদ্যযন্ত্র মেরামত করেও চলে তাঁর জীবিকা। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, গান-বাজনার চর্চা কমে যাওয়া এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে আসায় দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে তাঁর ব্যবসা।

একটি ঢোল কিংবা তবলা তৈরি করা মোটেও সহজ কাজ নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও নিপুণ কারিগরি দক্ষতা। ঢোল তৈরিতে প্রয়োজন হয় নিম বা আম কাঠের তৈরি বডি, ছাগলের চামড়া, গরুর চামড়ার বেল্ট, লোহার গুঁড়ি, ভাতের আঠাসহ বিভিন্ন উপকরণ। অন্যদিকে তবলা তৈরিতে কাঠের খোল, বিশেষ ধরনের চামড়া, বাঁধার ফিতা এবং সুর ঠিক করার জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ উপকরণ।

তবলার ওপরের কালো অংশ তৈরিতে ভাতের মাড় বা ভাত থেকে তৈরি আঠার সঙ্গে প্রয়োজনীয় উপাদান মিশিয়ে বিশেষ প্রলেপ দেওয়া হয়। এরপর তা শুকিয়ে বাদ্যযন্ত্রের সুর ঠিক করা হয়। একটি তবলার সেট তৈরি করতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। কাঠের বডি সংগ্রহ থেকে শুরু করে চামড়া লাগানো, শুকানো, ফিটিং ও সুর ঠিক করা—সব কাজই করতে হয় বিষ্ণুপদকে নিজের হাতে।

DHOL2

অর্ডার অনুযায়ী বিভিন্ন আকারের বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন তিনি। আম কাঠের বডির ঢোলের দাম চার থেকে সাত হাজার টাকা। নিম কাঠের বডির তবলার সেটের দাম প্রায় আট হাজার টাকা। মৃদঙ্গ পাওয়া যায় চার থেকে ছয় হাজার টাকার মধ্যে।

বিষ্ণুপদ দাস বলেন, প্রথমে আমার দাদু এই ব্যবসা শুরু করেন। দাদু মারা যাওয়ার পর বাবা দোকান চালিয়েছেন। বাবার মৃত্যুর পর আমি হাল ধরেছি। তিন পুরুষ ধরে আমরা এই একই কাজ করে আসছি। আমার বাবা যখন ব্যবসা করতেন, তখন ছয়-সাতজন কর্মচারী কাজ করতেন। ভালো আয় হতো, সংসারও ভালো চলত। এখন সেই অবস্থা নেই। নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, একসময় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করেছি। এখন সারা দিনেও অনেক সময় একটি কাজ জোটে না। আগে মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় হতো। এখন কোনো মাসে ১০-১২ হাজার, কোনো মাসে ১৩ হাজার টাকা হয়। আবার কোনো মাসে পাঁচ হাজার টাকাও হয় না। গত মাসে সব মিলিয়ে তিন-চার হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়েছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাদ্যযন্ত্র তৈরির উপকরণের দাম। রাজশাহী থেকে মালামাল কিনে আনতে হয় তাঁকে। কিন্তু দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে গেলে ক্রেতারা আগ্রহ হারান। ফলে লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, অনেক সময় পুঁজি ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে।

একসময় স্কুলের শরীরচর্চার (পিটি) জন্য ড্রামসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা ছিল। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীতচর্চা ও লোকজ আয়োজনেও নিয়মিত ব্যবহার হতো এসব বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চাহিদা কমেছে। নতুন বাদ্যযন্ত্র তৈরির অর্ডার না থাকায় পুরোনো বাদ্যযন্ত্র মেরামত করেই কোনো রকমে দিন পার করছেন তিনি।

বিষ্ণুপদ দাসের সংসারে রয়েছেন স্ত্রী, ছেলে ও মেজো ভাই। ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। নিজের কষ্টের কথা ভুলে প্রতিদিন দোকানে বসেন সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই। কিন্তু অনিশ্চিত আয়ের কারণে ছেলের পড়াশোনা ও পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

তিনি বলেন,একসময় আমি নিজে কাজ করার পাশাপাশি দু-তিনজন লোককে কাজ দিতাম। এখন নিজেই চলতে পারি না, অন্যকে কাজ দেব কীভাবে? যত দিন বেঁচে আছি, এই কাজই করে যেতে হবে। কারণ, এই কাজ ছাড়া আর কিছু শিখিনি। সরকার যদি আমাদের মতো ক্ষুদ্র কারিগরদের পাশে দাঁড়াত, কিছু অনুদান বা সহযোগিতা করত, তাহলে অন্তত বেঁচে থাকার সাহস পেতাম।

পাশের ওয়ার্কশপের দোকানদার জিয়া বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে ব্যবসা করছি। বিষ্ণুপদ দাসের দোকানটি এই এলাকার পুরোনো একটি প্রতিষ্ঠান। একসময় তাঁর দোকানে অনেক লোক কাজ করতেন। এখন কাজের অভাবে তাঁকে একাই বসে থাকতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটিই হারিয়ে যাবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইমন খান বলেন, এই দোকানটি আমাদের এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, এখানে বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামত করা হয়। এখন এমন কারিগর খুব বেশি নেই। বিষ্ণুপদ দাসের মতো মানুষেরা টিকে থাকতে না পারলে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অংশ হারিয়ে যাবে।

শিক্ষক অরবিন্দু পাল বলেন,বাদ্যযন্ত্র শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবলা, ঢোল, মৃদঙ্গের মতো বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে আমাদের সংগীত ও লোকজ সংস্কৃতি জড়িয়ে আছে। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে নতুন প্রজন্ম এ পেশায় আসতে আগ্রহী হবে না।

বিষ্ণুপদ দাসের ছোট্ট দোকানটি শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয় ,এটি বাগেরহাটের বাদ্যযন্ত্র তৈরির ঐতিহ্যেরও অংশ। তিন পুরুষের শ্রম, দক্ষতা ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে এর প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রে। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে।

একসময় যে দোকানে ছয়-সাতজনের কর্মসংস্থান ছিল, সেখানে এখন একজন কারিগরই টিকে থাকার লড়াই করছেন। তাঁর হাতের তৈরি বাদ্যযন্ত্রে হয়তো এখনো সুর ওঠে, কিন্তু সেই সুরের কারিগরের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার বিষাদ।