logo

ছেলের হত্যার মামলা না তোলায় বাবাকেও গুলি, আতঙ্কে ঢালী বাড়ি

মাসুম বিল্লাহ ইমরান
খুলনা
ছেলের হত্যার মামলা না তোলায় বাবাকেও গুলি, আতঙ্কে ঢালী বাড়ি
বাঁ থেকে নিহত ছেলে জয় ঢালী ও বাবা আক্তার ঢালী। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

খুলনার রূপসায় ছেলে জয় ঢালী (২৭) হত্যার দেড় মাসও পার হয়নি, এর মধ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তার বাবা আক্তার ঢালীকে (৬০)। সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দূর্জনীমহল এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে বেঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

একই পরিবারের বাবা-ছেলেকে পরপর হত্যার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশ ভয়ে হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে চাইছেন না।

স্থানীয় সূত্র ও স্বজনরা জানান, সোমবার সন্ধ্যায় বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে একটি বেঞ্চে বসেছিলেন আক্তার ঢালী। এসময় দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে পালিয়ে যায়। গুলির শব্দ শুনে পরিবারের সদস্যরা বাইরে গিয়ে তাকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্বজনরা দ্রুত তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্মী মোরাদ জানান, আক্তার ঢালীর ডান পাশের কাঁধের গোড়ার দিকে গুলির আঘাত রয়েছে। একটি মূল গুলির আঘাতের পাশাপাশি শরীরে ছররা গুলির আঘাতও থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। শর্টগান থেকে গুলি করা হয়ে থাকতে পারে।

এর আগে গত ১৫ আগস্ট রাতে একই এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালী। স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের ভাষ্য, ওই রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদের মোড় এলাকায় ৪ থেকে ৫ জনের একটি দল মোটরসাইকেলে গিয়ে জয়কে কুপিয়ে জখম করে। হামলাকারীদের কয়েকজন হেলমেট পরা ছিল। হামলার পর তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই জয় ঢালীর মৃত্যু হয়।

জয় হত্যার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন তার বাবা আক্তার ঢালী। এ ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন বলে জানা গেছে।

স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, জয় হত্যার পর মামলা প্রত্যাহারের জন্য আক্তার ঢালীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। তিনি মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে মামলার আসামিদের কয়েকজন জামিনে বের হওয়ার পর আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে ওই সূত্রের দাবি। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরেকটি স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, জয় ঢালী একটি ‘আশিক গ্রুপের’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রেম করে বিয়ের পর তার শ্বশুরবাড়ির পক্ষের লোকজনের সঙ্গে ‘বি কোম্পানি’ নামে পরিচিত একটি গ্রুপের বিরোধ তৈরি হয়। ওই বিয়ে-সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই জয়কে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সূত্রটি দাবি করেছে। তবে এ বিষয়টিও তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।

বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল দূর্জনীমহলে গিয়ে দেখা যায়, ঢালী বাড়িতে নেমে এসেছে নীরবতা। স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে অনেকে রাজি হননি। এমনকি নিহত আক্তার ঢালীর কবর কোথায়, সেটি দেখাতেও অনেকে ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয়দের শঙ্কা, হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খুললে তাদেরও ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরপর দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। স্বজনদের কেউ কেউ পারিবারিক বিরোধের কথা বললেও আক্তার ঢালী হত্যার সঙ্গে এর সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। হত্যার প্রকৃত কারণও এখনো স্পষ্ট নয়।

রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার জাহিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, দুর্বৃত্তদের গুলিতে আক্তার ঢালী গুলিবিদ্ধ হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। কারা এবং কী কারণে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে মামলা নেওয়া হবে।

খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, কিছুদিন আগে আক্তার ঢালীর ছেলে নিহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। এখন তার বাবা কেন নিহত হলেন, সেটিও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ ঘটনায় কারা জড়িত, সে বিষয়ে কিছু নাম ও তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১০ বছরে দূর্জনীমহলের ওই ঢালী বাড়িতে সাতজন খুন হয়েছেন। একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাড়িটি এখন স্থানীয়দের কাছে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

পুলিশের হিসেবে, চলতি বছর খুলনা জেলায় ৩৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রূপসা উপজেলায় ঘটেছে ১২টি।

আক্তার ঢালীর মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে তাকে দাফন করা হয়েছে।

দেড় মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে একই পরিবারের বাবা-ছেলে হত্যার ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জয় ঢালী হত্যার মামলার জেরেই কি আক্তার ঢালীকে টার্গেট করা হয়েছিল, নাকি দুই হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে আলাদা কোনো বিরোধ? পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ হলে হত্যার কারণ ও দুই ঘটনার যোগসূত্রের বিষয়টি স্পষ্ট হবে।