পান চাষে দুর্দিন, জীবিকার তাগিদে টিকে থাকার লড়াইয়ে খাসিয়ারা

সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে সারি সারি গাছ। সেসব গাছের গায়ে পেঁচিয়ে থাকা সতেজ সবুজ পানপাতা। মৌলভীবাজারের পাহাড়ঘেরা খাসিয়া পুঞ্জিগুলোর চিরচেনা এই দৃশ্য এখন অনেকটাই মলিন। আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ের ভাষায় পানকে বলা হয় ‘টেম্পেউ’।
শতবর্ষী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই পান চাষই তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, প্রকৃতির বিরূপ আচরণ, উৎপাদন বিপর্যয়, ন্যায্যমূল্যের অভাব এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাসিয়া পুঞ্জিগুলোতে নেমে এসেছে দুর্দিন। জীবিকা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে লড়াই করছেন শত শত খাসিয়া পরিবারের সদস্যরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৬৫টি খাসিয়া পুঞ্জি রয়েছে। এসব পুঞ্জিতে ঐতিহ্যগত ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে টিলার ছায়াঘেরা বনে পান চাষ করা হয়।
খাসিয়া সমাজব্যবস্থায় পান চাষে শ্রমের একটি সুন্দর বিভাজন রয়েছে। পুঞ্জির পুরুষেরা জুম বা পানের বাগানে গিয়ে গাছের পরিচর্যা করেন এবং পানপাতা সংগ্রহ করেন। অন্যদিকে নারীরা দলবদ্ধভাবে বসে অত্যন্ত নিপুণ হাতে পান সাজিয়ে বাজারজাতকরণের উপযোগী ‘গুছি’ তৈরি করেন। পরিমাপ অনুযায়ী, ১২টি পাতায় এক গুছি, ১২ গুছিতে এক কান্তা এবং ২০ কান্তায় এক কুড়ি পান হয়। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব পুঞ্জির সুস্বাদু ও গুণগত মানসম্পন্ন খাসিয়া পান মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে আসছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এই পান উৎপাদনকারীদের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
অন্যদিকে সার, কীটনাশকসহ পাহাড়ি জনপদে জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় উপকরণের দামও বেড়েছে বহুগুণ। মৌসুমভেদে প্রতি কুড়ি পান ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পানের আয় দিয়ে শ্রমিকদের মজুরি ও সংসারের মৌলিক খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন চাষীরা।
পান ব্যবসার এই দুর্দিন নিয়ে শ্রীমঙ্গলের নাহার পুঞ্জির বাসিন্দা ডিবারমিন পতাম আক্ষেপ করে বলেন, চলতি বছর মৌসুমের শুরুতে কিছুটা আশা জাগলেও জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অত্যন্ত কম দামে পান বিক্রি করতে হয়েছে। এখন শীতের আগমনে পানের মৌসুম শেষ পর্যায়ে। অনেক জুমে পান প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ফলে পুঞ্জির পরিবারগুলোকে চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে পানের উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় চাষীরা দিশাহারা। অনেকে মহাজন বা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান (সমাজপ্রধান) ফিলা পতমী এশিয়া পোস্টকে বলেন, পানের নানা রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ মোকাবিলা করে এ বছর যেটুকু উৎপাদন হয়েছে, তারও ন্যায্যমূল্য মেলেনি। চারদিকে সবকিছুর দাম বাড়ছে, অথচ আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস পানের দাম দিন দিন কমছে। সরকারি আর্থিক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে আজ আমাদের এই দুর্দিন দেখতে হতো না।
কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতিছড়া খাসিয়াপুঞ্জির হেডম্যান বিওয়ানলী সুঙ এশিয়া পোস্টকে বলেন, আগের মতো পাইকাররা পান কিনতে ন্যায্য দাম দিচ্ছেন না। পরিবার-পরিজন নিয়ে তীব্র আর্থিক অনটনে পড়তে হচ্ছে। তবু শত বছরের বাপ-দাদার ঐতিহ্য ও জীবিকার টানে পান চাষ ধরে রেখেছি। সংসারের খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে ঋণ করতে হচ্ছে।
আদিবাসী খাসিয়াদের সংগঠন খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং এশিয়া পোস্টকে বলেন, খাসিয়াদের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে পান চাষের ওপর নির্ভরশীল। জুমে পান কমে যাওয়া এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মসহ সবাই হতাশ। খাসিয়া পান বিদেশে রপ্তানি হয়ে দেশের সুনাম বাড়ালেও উৎপাদকেরা আজও অবহেলিত। সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও সঠিক বিপণনব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে এই ঐতিহ্য রক্ষা করা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, চাষীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। পান চাষে নতুন কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


