logo

জয়পুরহাটে আলুর বাজারে ধস, হিমাগারে পড়ে আছে ৪৫ শতাংশ

জয়পুরহাটে আলুর বাজারে ধস, হিমাগারে পড়ে আছে ৪৫ শতাংশ
জয়পুরহাটের হিমাগারে রাখা আলু। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জয়পুরহাটে আলুর বাজারে অব্যাহত দরপতনে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে আলু। এতে লোকসানের আশঙ্কায় হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন করছেন না অনেকে। জেলার ২২টি হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনো পড়ে রয়েছে। আগামী ১৫ নভেম্বর সংরক্ষণ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আলু বিক্রি করতে না পারলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে আলুর দাম বাড়ানো, রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি এবং হিমাগারে সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। লোকসানের আশঙ্কায় হিমাগার মালিকেরা জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহায়তা চেয়েছেন। অন্যদিকে সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়াতে হিমাগারগুলোতে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা কৃষি বিপণন অফিস।

জানা গেছে, আলু উৎপাদনে দেশের অন্যতম জেলা জয়পুরহাট। গত মৌসুমে জেলায় ৯ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিকটন আলু উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদন মৌসুমে বাজারে আলুর দাম কম থাকায় কৃষকেরা লোকসানে পড়েন। পরে দাম বাড়ার আশায় জেলার ২২টি হিমাগারে ২ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বাজারে প্রত্যাশিত দাম না থাকায় এখন উৎপাদন খরচ ও হিমাগারের ভাড়া তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন খরচ মিলিয়ে স্টেরিক, কার্ডিনাল ও বারো-তেরো জাতের ৬০ কেজির এক বস্তা আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৫০ টাকা। অথচ হিমাগার গেটে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫৫০ থেকে ৬৭০ টাকায়। দেশি পাকড়ি জাতের এক বস্তা আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ টাকা। বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০ টাকায়। এতে জাত ভেদে প্রতি বস্তা আলুতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে আলু কিনে ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিতে হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ব্যবসায়ীরা আলু উত্তোলন না করলেও হিমাগার মালিকেরা চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতে পারেন না। অথচ বিদ্যুৎ বিলসহ হিমাগারের পরিচালন ব্যয় তাঁদেরই বহন করতে হয়। ফলে আলু পড়ে থাকলে লোকসানের চাপ বাড়ে হিমাগার মালিকদের ওপরও।

এবার হিমাগারে আলু সংরক্ষণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলু উত্তোলন না হলে বিদ্যুৎ বিল, ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি বস্তায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন হিমাগার মালিকেরা।

সদরের আমদই গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, আলুর দাম বাড়বে আশায় হিমাগারে ১৫০ বস্তা আলু রেখেছিলাম। এরমধ্যে ৫০ বস্তা কোনো লাভ ছাড়াই বিক্রি করেছি। এখনো ১০০ বস্তা আলু পড়ে আছে। বর্তমান বাজারে বিক্রি করলে অর্ধেক লোকসান হবে। ঋণ-দেনা তো পরিশোধ হবেই না, উল্টো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হব। আলু নিয়ে কী করব, মাথাই কাজ করছে না।

ক্ষেতলালের হিমাদ্রিপাড়ার কৃষক বাবু মিয়া বলেন, হিমাগারে ৫০ বস্তা আলু রেখেছি। বর্তমান বাজারে বিক্রি করলে অনেক লোকসান হবে। আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সংরক্ষণের মেয়াদ আছে। এর মধ্যে দাম না বাড়লে কীভাবে বিক্রি করব? পরে মেয়াদ না বাড়ালে আলু কোথায় নিয়ে যাব? সরকারের কাছে অনুরোধ, হিমাগারে আলু রাখার মেয়াদ ও আলুর দাম বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হোক।

তিলাবদুল মধ্যপাড়ার ব্যবসায়ী আলাল হোসেন বলেন, এক বস্তা আলুতে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২৫০ টাকা, অথচ বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকায়। গত তিন-চার বছর ধরে লোকসান গুনতে গুনতে জমি-জমা সব শেষ। এখন যে ঋণ আছে, তা কীভাবে শোধ করব? ঋণ পরিশোধ করতে বাড়িও বিক্রি করতে হতে পারে। সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলে আমি একেবারে শেষ।

হিমাদ্রি হিমাগারের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার হিমাগারে ৫০ শতাংশ আলু বের হয়েছে। বাজারমূল্য একেবারেই কম হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু উত্তোলন করছেন না। চুক্তির মেয়াদ পার হয়ে আলু পড়ে থাকলে সব লোকসান আমার। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হব। সরকার আলু রপ্তানির সুযোগ দিলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।

জেলা কৃষি বিপণন অফিস জানিয়েছে, হিমাগারে আলু সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হিমাগারগুলোতে চিঠি দেওয়া হবে।