logo

ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল টেনেও মিলছে না মাছ, সংকটে ২১ হাজার জেলে

শাওন মোল্লা
শাওন মোল্লা, জামালপুর
ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল টেনেও মিলছে না মাছ, সংকটে ২১ হাজার জেলে
জীবিকার প্রয়োজনে নদীতে জাল টেনে মাছ ধরার চেষ্টা করছেন স্থানীয় জেলেরা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

একসময় জামালপুরের যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাই, দশআনী ও সুবর্ণখালী নদী ছিল দেশীয় মাছের অন্যতম উৎস। এসব নদীতে সারা বছরই মিলত নানা প্রজাতির মাছ, আর তা ধরেই জীবিকা নির্বাহ করতেন হাজারো জেলে। তবে নদীর পরিবেশগত পরিবর্তন, অবৈধ জালের ব্যবহার ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ার কারণে দেশীয় মাছের সংখ্যা দিনদিন কমে যাচ্ছে। ফলে চরম জীবিকার সংকটে পড়েছেন জেলার ২১ হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলে।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়ায়নি। আশপাশের বাড়িগুলোতে যখন দিনের রান্নার প্রস্তুতি চলছে, তখন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইল এলাকার জেলে জলধর নমশূদ্রের ঘরে তখনও চুলায় আগুন জ্বলেনি। তিন কন্যাসন্তানের জনক জলধর সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে ছুটে যান যমুনা নদীতে। আশায় থাকেন, জালে ধরা পড়া মাছ বিক্রি করে অন্তত আজকের দিনের খাবার জুটবে। কিন্তু ঘণ্টাখানেক জাল টেনে তার জালে ওঠে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকার মাছ। সেই মাছ বাজারে বিক্রি করবেন, নাকি বাড়িতে নিয়ে সন্তানদের মুখে তুলে দেবেন—প্রতিদিনই এমন দোটানায় পড়েন তিনি। জলধরের এই জীবনচিত্র যেন জামালপুরের হাজারো নদীনির্ভর জেলেপরিবারের বর্তমান বাস্তবতারই প্রতিফলন।

জলধর নমশূদ্র আফসোস করে বলেন, একটা খেও দিতে এক-দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ মাছ ওঠে ১০০-১৫০ টাকার। ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ করে জাল-নৌকা কিনেছি। এগুলো বিক্রি করব নাকি নিজে খাব? আমার আর পোষায় না। তিনটে মেয়ে আছে, তাদের পড়াশোনা আর সংসারের খরচ আছে। এই ১০০-১৫০ টাকা দিয়ে মেয়েগুলোকে কীভাবে বিয়ে দেব? নদীতে মাছ নেই, দিনদিন কমে যাচ্ছে। পানি আছে, কিন্তু আগের মতো মাছ নেই।

শুধু জলধর নন, জেলার অধিকাংশ নদীনির্ভর জেলের অবস্থাই এক। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র তীরের জেলেরা জানান, কয়েক বছর আগেও যেসব মাছ সহজে পাওয়া যেত, এখন সেগুলোর অনেক প্রজাতিই বিরল হয়ে গেছে।

৩৫ বছর ধরে মাছ ধরা জেলে জগন্নাথ নমশূদ্র বলেন, আগে বাতাসি, বউমাছ, চিংড়ি, বাঁশপাতারি প্রচুর পাওয়া যেত। এখন এসব মাছ দেখাই যায় না। নদীতে মাছ নেই, মানুষের পাতেও নেই।

সংকটে পড়ে অনেক জেলে বাধ্য হয়ে পেশা বদলাচ্ছেন। কেউ মাছের ব্যবসা, কেউ দিনমজুরি বা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। আবার অনেকেই জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমিয়েছেন।

ইসলামপুরের মাছ ব্যবসায়ী নিতাই নমশূদ্র জানান, নদীর মাছ দিয়ে আর সংসার চলে না। তাই বাধ্য হয়ে পুকুরের চাষের মাছ কেনাবেচা করেন, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে।

স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, অবৈধ কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি ও সূক্ষ্ম ফাঁসের জালের কারণে প্রতিদিন মাছের পোনা ও ডিম ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানিদূষণ ও স্থানে স্থানে বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

জেলে নিরঞ্জন চন্দ্র দাস বলেন, ২০-৩০ বছর আগে যেসব মাছ ধরে খেয়েছি, সেগুলো এখন আর পাওয়া যায় না। বড় বড় বেড়জাল দিয়ে মাছ ঘিরে ফেলা হয়। ৫০টি মাছ উঠলে দেখা যায় দেড় লাখ পোনা নষ্ট হচ্ছে। এরা এই নেটজাল, চায়না জাল ও কেমিক্যাল ব্যবহার করে দেশের ক্ষতি করছে।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, জলাশয়ের গভীরতা কমে যাওয়া ও পানি শুকিয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক মাছের আবাস্থল নষ্ট হচ্ছে। নদী ও বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দেওয়ার ফলে মাছ স্রোতশীল পরিবেশ পায় না, যার কারণে প্রজননের সুযোগ কমে যায়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ আর চাষ করা মাছের স্বাদ কখনোই এক নয়, কৃত্রিম খাবার ও পরিবেশগত ভারসাম্যের অভাবই মূলত এর জন্য দায়ী।

জামালপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আ ন ম আশরাফুল কবীর জানান, বাংলাদেশে ২৬১টি দেশীয় প্রজাতির মাছের মধ্যে প্রায় ৬০টি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিনি বলেন, মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণে জেলার সাতটি উপজেলায় সাতটি অভয়াশ্রম রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদীতে দুটি স্থায়ী অভয়াশ্রম নির্মাণের কাজ চলছে এবং ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলায় অভয়াশ্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, অবৈধ জাল বন্ধ করা, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ ও অভয়াশ্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশীয় মাছ ফেরানোর চেষ্টা চলছে। সবার সহযোগিতা পেলে হারানো মাছ উদ্ধার সম্ভব।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরে বর্তমানে ২১ হাজার ৩১৮ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। নদীতে মাছের সংকট শুধু তাদের জীবিকাকেই নয়, নদীকেন্দ্রিক লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে দেশীয় মাছের পাশাপাশি নদীনির্ভর এই প্রাচীন পেশাটিও হারিয়ে যেতে পারে।