logo
Advertisement

বাগেরহাট/স্বপ্ন ছিল মাছ-সবজির, কোল্ড স্টোরেজে এখন রাজত্ব আলুর

স্বপ্ন ছিল মাছ-সবজির, কোল্ড স্টোরেজে এখন রাজত্ব আলুর
কোল্ড স্টোরেজের মেঝেজুড়ে রাখা আলুর স্তূপ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

৩ হাজার ২০০ টন পণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা, চারটি শেড ও সাড়ে পাঁচ একর জমির ওপর বিশাল অবকাঠামো—সবই করা হয়েছিল বাগেরহাটের কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য। স্বপ্ন ছিল মাছ, সবজি ও ফলসহ বিভিন্ন পচনশীল পণ্য সংরক্ষণ করে কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু চার বছর না পেরোতেই সেই স্বপ্ন অনেকটাই থমকে গেছে। বর্তমানে চারটি শেডের মধ্যে দুটিতে প্রায় ১৪ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করেই চলছে বাগেরহাটের প্রথম হিমাগার ‘বি.ই কোল্ড স্টোরেজ অ্যান্ড এগ্রো প্রসেসিং লিমিটেড’। বাকি দুটি শেড কার্যত অব্যবহৃত পড়ে আছে।

বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ এলাকার মুনিগঞ্জ ব্রিজ রোডের হাড়িখালীতে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এটি বাগেরহাট জেলার প্রথম হিমাগার।

সাড়ে পাঁচ একর জমির ওপর নির্মিত এই হিমাগারে একসঙ্গে প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন পণ্য সংরক্ষণের সুবিধা রাখা হয়। ভবিষ্যতে এর ধারণক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল।

উদ্বোধনের সময় উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বাগেরহাট ও আশপাশের এলাকায় উৎপাদিত সবজি, সাদা মাছ, ইলিশ এবং বিভিন্ন ধরনের ফল সংরক্ষণ করা হবে। উৎপাদনের পরপরই কম দামে বিক্রি না করে কৃষক ও মৎস্যজীবীরা তা হিমাগারে সংরক্ষণ করবেন এবং উপযুক্ত সময়ে বাজারজাত করতে পারবেন—এমনটাই ছিল প্রত্যাশা।

তবে কার্যক্রম শুরুর পর মাছ সংরক্ষণ লাভজনক না হওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে সবজি ও ফল সংরক্ষণের পরিকল্পনাও কার্যকরভাবে এগোয়নি। ফলে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি আলুসংরক্ষণনির্ভর হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে প্রায় ১৪ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতি বস্তা আলু মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংরক্ষণের জন্য নেওয়া হয় ৩০০ টাকা।

কোল্ড স্টোরেজে আনার পর আলু সরাসরি হিমঘরে রাখা হয় না। প্রথমে ‘প্রি-কুলিং’য়ের মাধ্যমে আলুর তাপমাত্রা কমিয়ে আনা হয়। এরপর অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তা হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়। এ সময় নষ্ট বা বাজারে বিক্রির অনুপযোগী আলু আলাদা করে ফেলা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব আলু পরবর্তীতে মাছের খামারে খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের কথা রয়েছে।

চারটি শেড নিয়ে বড় পরিসরে নির্মিত হলেও বর্তমানে মাত্র দুটিতে আলু রাখা হচ্ছে। বাকি দুটি ব্যবহার না হওয়ায় হিমাগারটির উল্লেখযোগ্য অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। ফলে উদ্বোধনের সময় ৩ হাজার ২০০ টন সংরক্ষণ সক্ষমতা নিয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মনে যে আশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তার পুরোটা কাজে আসছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা সাগর শেখ বলেন, কোল্ড স্টোরেজটি যখন চালু হয়, তখন আমরা আশা করেছিলাম যে এলাকার কৃষকেরা তাদের মাছ, সবজি ও অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে কৃষকেরা উপকৃত হবেন এবং এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যও বাড়বে। কিন্তু এখন কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রায়হান শেখ বলেন, চারটি শেড নিয়ে এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান করা হয়েছিল। অথচ এখন দুটি শেডে আলু রাখা হচ্ছে, অন্যগুলো তেমন ব্যবহার হচ্ছে না। হিমাগারটি পুরোপুরি চালু থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আরও বেশি সুবিধা পেতেন।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। আলু ওঠানো-নামানো, বস্তাবন্দী করা, পরিবহন ও হিমঘরে সংরক্ষণের কাজের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত। নারী শ্রমিকেরা দৈনিক প্রায় ৩০০ টাকা এবং পুরুষ শ্রমিকেরা প্রতি বস্তা আলু নামানোর জন্য ৩৫ টাকা করে মজুরি পান। তবে আলু সংরক্ষণের মৌসুম ছাড়া বছরের অন্য সময়ে কাজের চাপ অনেকটাই কমে যায়।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি লিয়াকত হোসেন লিটন। ২০২২ সালে উদ্বোধনের সময়ও তিনি প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে লিয়াকত হোসেন লিটন এলাকায় নেই। তার অনুপস্থিতিতে জি এম মো. মিজানুর রহমানের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কার্যক্রম, বিদ্যুৎ বিলের ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে জিএম মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে কৃষকেরা উৎপাদনের পরপরই কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন না। সংরক্ষণ করে উপযুক্ত সময়ে বাজারজাত করতে পারলে তারা ভালো দাম পান। বাগেরহাটে এ ধরনের সংরক্ষণ সুবিধা কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, হিমাগারটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি ও ফলসহ বিভিন্ন পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

মাছ, সবজি ও ফল সংরক্ষণের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কৃষি ও মৎস্য খাতে নতুন সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই বড় অবকাঠামো নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বাগেরহাটের প্রথম এই কোল্ড স্টোরেজ। কিন্তু চার বছর পর সেই অবকাঠামোর অর্ধেকই অব্যবহৃত। এখন কেবল আলু সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম।