‘মৃত্যুর আগে মা এক ফোঁটা পানিও পায়নি, তাৎক্ষণিক চিকিৎসাও পায়নি’

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে সিঁড়ি থেকে পড়ে আহত হন কুলসুমা। এসময় তার মেয়ে মাকে পানি পান করিয়ে বাঁচাতে সামনে যাকে পায়, তার কাছেই পানি চায়; কিন্তু কেউ পানি দিয়ে সহায়তা করেনি। অচেতন হওয়ার পর দীর্ঘ সময় অক্সিজেন লাগানো অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে থাকলেও উপযুক্ত চিকিৎসা পায়নি কুলসুমা বলে দাবি করেছে তার পরিবার।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা হলে মারা যাওয়া কুলসুমার ১৮ বছরের মেয়ে মীম জানান, মৃত্যুর আগে মা এক ফোঁটা পানিও পায়নি, তাৎক্ষণিক চিকিৎসাও পায়নি।
তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের শহীদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুমা (৩৫)। শহীদুল রিকশা চালিয়ে ও অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
সরেজমিনে শহীদুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় জানাজা শেষে কুলসুমার দাফন হয়েছে। ঘরের সামনে পাশাপাশি দুটি চেয়ারে বসে হাউমাউ করে কাঁদছে কুলসুমার ১২ বছরের শিশু ছেলে স্বাধীন ও ১৮ বছরের মেয়ে মীম। অনেকক্ষণ কাঁদতে কাঁদতে একপর্যায়ে গলার কণ্ঠ বসে যায় তাদের। পরিবারের লোকজন, স্বজন ও এলাকাবাসী তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন।
মীম জানান, স্বাধীন জন্ডিসে আক্রান্ত। তাই ১১ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিল স্বাধীন। আগুন লাগার কারণে জীবন বাঁচাতে কুলসুমা তার সন্তান স্বাধীন ও মীমকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে চেষ্টা করেন। এসময় সিঁড়ি দিয়ে আরও অনেক রোগী ও তাদের স্বজনরাও তাড়াহুড়ো করে নামছিল। চারতলার সিঁড়ি পর্যন্ত আসতেই ধাক্কায় হঠাৎ লোকজনের ধাক্কায় কুলসুমা পড়ে যায়। এসময় মীম সরাসরি কুলসুমার ওপর পড়ে। মীমের ওপর পড়ে আরও ৫ থেকে ৬ জন।
মীম আরও জানান, এসময় কুলসুমাকে টেনে তুলতে আশপাশের লোকজনকে অনুরোধ করে। একটু পানি দিয়ে সহায়তা করতে চিৎকার করে বলতে থাকে মীম। কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। এরই মধ্যে কুলসুমা অজ্ঞান হয়ে যায়। একপর্যায়ে দুজন লোকের সহায়তায় মেঝেতে একটি পাটি বিছিয়ে কুলসুমাকে শুইয়ে রাখা হয়। পরে তাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার অনেকক্ষণ পর চিকিৎসকরা কুলসুমাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মীম বলে, আমার মাকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের অনুরোধ করি। কিন্তু মা ওই সময় অক্সিজেন ছাড়া আর কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা পায়নি। যখন মাকে বাঁচাতে তাড়াহুড়ো করে জরুরি বিভাগে গিয়েছি, তখনও ২০ টাকা দিয়ে একটি রিসিট কাটতে হয়েছে। আমি বলেছিলাম, আগে চিকিৎসা শুরু হোক, পরে টাকা দিচ্ছি। কিন্তু আমার কথা কেউ গুরুত্বই দেয়নি।
এদিকে ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছিলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে শিশুসহ ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে সোমবাব রাতে এই তথ্য ভিত্তিহীন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। তিনি বলেন, তিনি ছয়জনের মৃত্যুর কথা শোনেছেন। বিষয়টি খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে পদদলিত হয়ে কেউ মারা গেছেন— এমন প্রমাণ তিনি এখনও পর্যন্ত পাননি। এ ধরনের কোনো প্রমাণ পেলে তিনি সেটা যাচাই করে দেখবেন।
এসময় তিনি জানান, হাসপাতালে জরুরি বিভাগ, মর্গের তথ্য ছাড়াও তার কাছে আরও একটি তালিকা রয়েছে। সবগুলো যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত পরিস্থিতি বলা যাবে।
তবে এ ঘটনায় ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কমিটির প্রধান করা হয়েছে হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমানকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন খান, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও গণপূর্ত বিভাগের বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী।



