logo

১৪ বছরের বিআরটি প্রকল্প বাতিল, ৩৩ কোটি টাকার ডিপোর কী হবে

১৪ বছরের বিআরটি প্রকল্প বাতিল, ৩৩ কোটি টাকার ডিপোর কী হবে
গাজীপুরের নলজানিতে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের বাস ডিপো। ছবি: এশিয়া পোস্ট

১৪ বছর ধরে চলা গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রকল্পের অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটি দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এ প্রকল্পের আওতায় গাজীপুরের নলজানিতে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাস ডিপোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ডিপোটি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হবে, নাকি অব্যবহৃত পড়ে থাকবে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নলজানিতে বাস ডিপো নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩১ কোটি ৬৩ লাখ ৯১ হাজার টাকা। পরে চুক্তিমূল্য দাঁড়ায় ৩২ কোটি ৫৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নির্মাণকাজ শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২২ জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রায় পাঁচ একর জায়গার ওপর নির্মিত এ ডিপোতে ৯৪টি বাস রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

ডিপোটিকে শুধু বাস রাখার জায়গা হিসেবে নয়, বিআরটি বাসের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। সেখানে বাস পার্কিং, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ভবন, বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও ফিলিং স্টেশন রাখার পরিকল্পনা করা হয়। এ ছাড়া বাস ধোয়ার স্থান, বর্জ্য সংরক্ষণাগার, তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি), পানির জলাধার, সীমানাপ্রাচীর, প্রবেশপথ ও নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য কক্ষ রাখার ব্যবস্থাও ছিল।

তবে ডিপো নির্মাণের কয়েক বছর পরও সেখানে নতুন করে কাজের প্রয়োজন দেখা দেয়। ২০২৪ সালে ডিপোটিতে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ওই কাজের আওতায় অগ্নিনির্বাপণ পাম্প, জকি পাম্প ও অগ্নিসংকেত নিয়ন্ত্রণ প্যানেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম স্থাপনের কথা ছিল। এ কাজের জন্য আট মাস সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল।

নলজানি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল জায়গাজুড়ে নির্মিত বাস ডিপোটিতে তেমন কর্মচাঞ্চল্য নেই। সেখানে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পাঁচজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে ডিপোর ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দেন।

নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা রয়েছে, কাউকে ডিপোর ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। ফলে ডিপোর ভেতরের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে দেখা সম্ভব হয়নি। এদিকে গাজীপুরের জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারা ডিপোটি পরিদর্শন করেছেন বলে জানা গেছে। তবে তাদের পরিদর্শনের উদ্দেশ্য ও পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে তারা হতাশ। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের নির্মাণকাজের কারণে ভোগান্তি পোহানোর পর এখন নির্মিত অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়েও তাদের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নলজানির বাসিন্দা সারেয়ার হোসেন বলেন, এত টাকা খরচ করে ডিপো করা হলো। এখন যদি বিআরটি না থাকে, তাহলে এই স্থাপনা কী হবে? এটা তো আর ভেঙে ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারের উচিত অন্য কোনো কাজে এটি ব্যবহার করা। বিআরটি প্রকল্পের কারণে বছরের পর বছর মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এখন প্রকল্প বাতিল হলে অন্তত নির্মিত স্থাপনাগুলো যেন নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা থাকা দরকার।

সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে সড়কটি ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ক চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানা গেছে। তবে নলজানি বাস ডিপোর ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে এখনও স্পষ্ট সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।

গাজীপুর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ বিষয়ে সর্বশেষ সভা বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রকল্প নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য তাদের কাছে আসেনি।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আপনারা যা জানেন, আমরাও ততটুকুই জানি। তার ভাষ্য, যেসব দেশে এ ধরনের পরিবহনব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেসব দেশের পরিবেশ ভিন্ন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি চালু করা যাচ্ছে না বলেই সরকার প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ডিপোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে বাস ডিপোর ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সাব্বিন ফেরদৌস খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে তথ্য বা মন্তব্য দিতে রাজি হননি।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, বিআরটি প্রকল্প বা বাস ডিপোর বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তাদের কিছু জানানো হয়নি। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে একটি সভা রয়েছে। সেখানে আলোচনার পর যে সিদ্ধান্ত আসবে, তা জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।