logo

প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত দিনাজপুরের কারিগররা

প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত দিনাজপুরের কারিগররা
শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে দিনাজপুরে দেবী প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আর মাত্র কয়েক দিন পরেই শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে দিনাজপুরের বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। দিনরাত পরিশ্রম করে কাদামাটি, খড়, বাঁশ, সুতলি ও রং-তুলির নিপুণ ছোঁয়ায় দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য প্রতিমাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিচ্ছেন তারা।

আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। পূজার সূচি অনুযায়ী ১৫ অক্টোবর মহাপঞ্চমী, ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী অনুষ্ঠিত হবে।

প্রতিমা তৈরির প্রথম ধাপে বাঁশ ও খড় দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর তাতে মাটির প্রলেপ দিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিমার আকৃতি দেওয়া হয়। কয়েক দফা মাটি দেওয়ার পর চলে ফিনিশিংয়ের কাজ। সবশেষে রংতুলির নিপুণ আঁচড়ে প্রতিমায় ফুটিয়ে তোলা হয় দেবী ও তার পরিবারের সদস্যদের অবয়ব। দুর্গাপ্রতিমার পাশাপাশি মণ্ডপগুলোতে তৈরি করা হচ্ছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, অসুর, সিংহ, মহিষ, পেঁচা, হাঁস ও সর্পসহ বিভিন্ন প্রতিমা। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা সেট তৈরি করতে কারিগরদের দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন মন্দির ও প্রতিমা তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক ও অসুরের প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা। কোথাও চলছে খড় ও বাঁশের কাঠামো তৈরির কাজ, কোথাও কাদামাটির প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে; আবার কোনো কোনো মণ্ডপে প্রতিমার শেষ ধাপের কাজ হিসেবে রং ও সাজসজ্জা চলছে। কারিগরদের নিপুণ হাতে ধীরে ধীরে মাটির কাঠামোতে ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার রূপ। পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করছেন তারা।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শাস্ত্রমতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন হবে ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন হবে নৌকায়। দেবীর আগমনকে ঘিরে তাই ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা।

প্রতিমা কারিগর জগন্নাথ জানান, তিনি এবার ১২টি মণ্ডপের কাজ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে ১০টির কাজ সম্পন্ন করেছেন এবং বাকি দুটিতে কাজ চলছে। তিনি আরও জানান, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে কমিটি পূজার বাজেট বাড়াচ্ছে না। ফলে সবকিছু কিনে কাজ করে তাদের পোষায় না। একটি পূর্ণাঙ্গ দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে প্রায় দুই মাস বা তারও বেশি সময় লাগে। মণ্ডপের আকার, প্রতিমার নকশা এবং আয়োজকদের চাহিদার ওপর সময় কমবেশি হয়। পূজা ঘনিয়ে আসায় এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে দিনরাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

আরেক প্রতিমা কারিগর সবুজ চন্দ্র সেন বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিমা তৈরির খরচও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মজুরি বাড়েনি। ফলে এত পরিশ্রম করেও এবার তেমন একটা লাভ হবে না।

প্রতিমা কারিগর নরেশ পাল বলেন, দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরি আমাদের কাছে শুধু পেশা নয়, এটি শিল্প ও ঐতিহ্যের অংশ। একটি কাঠামোকে ধীরে ধীরে মাটি দিয়ে প্রতিমার রূপ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সেটিকে সুন্দর করে তোলা অনেক পরিশ্রমের কাজ। তবে প্রতিমা তৈরির পর মানুষের আনন্দ দেখে আমাদের পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।

দিনাজপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের হিসাবমতে, জেলায় এবার ১ হাজার ৩০৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে দিনাজপুর সদরে ১৭০টি, বীরগঞ্জে ১৬৬টি, কাহারোলে ১০০টি, বিরলে ৯৮টি, বোচাগঞ্জে ৮৩টি, চিরিরবন্দরে ১৫৮টি, খানসামায় ১৪৪টি, ফুলবাড়ীতে ৬২টি, পার্বতীপুরে ১৫১টি, বিরামপুরে ৪৩টি, নবাবগঞ্জে ৭৩টি, হাকিমপুরে ২২টি এবং ঘোড়াঘাট উপজেলায় ৩৬টি মণ্ডপ রয়েছে।

এদিকে আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতিমূলক সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্বরূপ বকসী বাচ্চু বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা সুষ্ঠুভাবে পালনের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন একাধিকবার বৈঠক করেছে। আমরা ইতিমধ্যে জেলার সব পূজামণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চিঠি দিয়েছি। পাশাপাশি প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করা হয়েছে।

নিরাপত্তার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পূজার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে

পূজা উদযাপন কমিটিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।