logo

বরগুনা/এক বছরে ইলিশ কমেছে ২১ শতাংশ, ভরা মৌসুমেও লোকসানে জেলেরা

এক বছরে ইলিশ কমেছে ২১ শতাংশ, ভরা মৌসুমেও লোকসানে  জেলেরা
বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে বরফজাত করে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য সংগৃহীত ইলিশ মাছ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সাগর ও নদীতে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে ইলিশ। ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটায় ইলিশের সরবরাহ অনেকটাই কমে গেছে। ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম আকাশচুম্বী।

বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র (বিএফডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১২ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাথরঘাটা কেন্দ্রে ইলিশ অবতরণ হয়েছিল ৭৬৮.০৫ টন। অথচ চলতি বছরের একই সময়ে ইলিশ এসেছে মাত্র ৬০৫.৫৬ টন। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে এখানে ইলিশের সরবরাহ বা অবতরণ কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ।

জেলে ও ব্যবসায়ীদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে সহসাই ভোক্তা পর্যায়ে ইলিশের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, প্রশাসনের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে বেপরোয়া ট্রলিং ও নিষিদ্ধ জালে জাটকা নিধন চলায় দিন দিন নদী ও সাগরে ইলিশ শূন্য হয়ে পড়ছে।

গত ১১ জুন ইলিশ রক্ষায় সরকারের দেওয়া ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আশায় বুক বেঁধে সাগরে নেমেছিলেন বরগুনার জেলেরা। কিন্তু ভরা মৌসুমের তিন মাস পার হতে চললেও নদী বা সাগরে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। এতে উপকূলের প্রায় এক লাখ জেলে ও মৎস্যজীবীর চোখে-মুখে এখন শুধুই হতাশার ছাপ।

সাগরে মাছ শিকার শেষে ট্রলারের পাটাতনে ও ঝুড়িতে বরফজাত করে রাখা হয়েছে ইলিশ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
সাগরে মাছ শিকার শেষে ট্রলারের পাটাতনে ও ঝুড়িতে বরফজাত করে রাখা হয়েছে ইলিশ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাথরঘাটার জেলে মালেক মিয়া বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর থেকেই সাগরে বারবার নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বহুবার খালি হাতেই ফেরত আসতে হয়েছে। ভেবেছিলাম এ মৌসুমে ইলিশ বিক্রি করে সব ঋণ শোধ করব, কিন্তু সাগরে যে মাছ মিলছে, তাতে ট্রলারের জ্বালানি ও যাতায়াত খরচই উঠছে না।

বরগুনার পাথরঘাটার ট্রলার মালিক মো. খলিল জানান, গভীর সাগরে মাছ ধরার জন্য তার চারটি ট্রলার রয়েছে। তিনি বলেন, ভেবেছিলাম এবার আগের মতো পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়বে। কিন্তু আমার অধিকাংশ ট্রলারই কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে লোকসান গুনেছে। সাগরে অবৈধ খুঁটা জাল আর কাঠের ট্রলিং জাহাজের অবাধ বিচরণে ইলিশসহ হাজারও প্রজাতির মাছের পোনা ধ্বংস হচ্ছে। সরকারি আইন মেনে মাছ শিকার করতে গিয়ে আমাদের প্রতি পদে পদে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, সরকারঘোষিত নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং সাগরে অবৈধ জাল ও কাঠের ট্রলিং ট্রলার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এগুলো বন্ধ করা না গেলে প্রতি বছরই মাছের পরিমাণ এভাবে কমতে থাকবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বেপরোয়া ট্রলিং ট্রলার ও ছোট ফাঁসের নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারের কারণে বড় পরিসরে জাটকা ও রেণু পোনা ধ্বংস হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইলিশের সার্বিক উৎপাদনে, যা নদী ও সাগরকে ইলিশশূন্য করে তুলছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন বরগুনার উপকূলীয় এলাকার প্রায় এক লাখ জেলে ও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পেশাজীবীরা।

এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানান, মাছের উৎপাদন বাড়াতে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে অবৈধ ট্রলিং ট্রলার মালিকদের নিত্যনতুন কৌশলের কারণে অনেক সময় সাগরে বেআইনিভাবে মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।