logo

রামু সহিংসতার ১৪ বছর/ফিরেছে সম্প্রীতি, ঝুলে আছে বিচার

• ১৯ মামলা থেকে পাঁচটি প্রত্যাহার

• ১৪ মামলার বিচারের অপেক্ষা

• পরিবারসহ ফ্রান্সে সেই উত্তম বড়ুয়া

লোকমান হাকিম
রামু, কক্সবাজার
ফিরেছে সম্প্রীতি, ঝুলে আছে বিচার
লালচিং, সাদাচিং ও অর্পণাচরণ বৌদ্ধ মন্দির এবং মৈত্রী বিহার। কক্সবাজারের রামুর রামু উপজেলা সদরের চৌমুহনী স্টেশন এলাকায়। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কক্সবাজারের রামু বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধপল্লিতে সহিংসতার ১৪ বছরে অনেকটা ক্ষত মুছে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ফিরে এসেছে সম্প্রীতি। ঝুলে আছে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সেই রাতের ঘটনায় হওয়া মামলাগুলোর বিচার। বছরের পর বছর ধরে হাজিরা দিতে হচ্ছে আসামিদের। সাক্ষীদের অনাগ্রহে এগোচ্ছে না বিচারপ্রক্রিয়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ এনে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুতে বৌদ্ধবিহার ও বসতঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেদিন রামুর ১২টি বৌদ্ধবিহার ও ৩০টি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পর দিন বিকেলে উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজার সদরে আরও সাতটি বিহার ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ধ্বংস হয় কয়েকশ বছরের পুরোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও পুরাকীর্তি।

রামুর কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
রামুর কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে রামুতে ফিরেছে সম্প্রীতি। পুড়ে যাওয়া বিহারের জমিতে এখন দাঁড়িয়ে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। ধর্মীয় উৎসব ও পূজাপার্বণে বিহার প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে পূণ্যার্থী ও পর্যটকের পদচারণায়। বাড়ে সব ধর্মের মানুষের উপস্থিতি।

কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু এশিয়া পোস্টকে বলেন, বৌদ্ধরা দৃষ্টিনন্দন বিহার পেয়েছে। হারানো সম্পদের অনেকটা নতুন করে তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা–সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। কিন্তু মামলাগুলোর বিচার এখনও শেষ হয়নি। বৌদ্ধদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হচ্ছে।

পরিবারসহ ফ্রান্সে সেই উত্তম বড়ুয়া

কয়েকটি সূত্র জানায়, ১৪ বছর আগে উত্তম বড়ুয়া নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া পোস্টে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধপল্লিতে হামলা হয়েছিল। রামু সদর উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের হাইটুপী গ্রামের বাসিন্দা সুদত্ত বড়ুয়ার ছেলে উত্তম বড়ুয়া বর্তমানে ফ্রান্সে রয়েছেন। তার স্ত্রী ও ছেলে সেখানে পাড়ি জমিয়েছেন। ঘটনার পর তাকে ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর প্রথম প্রকাশ্যে দেখা যায়।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের সেই রাতের পর থেকে উত্তম বড়ুয়ার কোনো খোঁজ ছিল না। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে ফেসবুকে ছবি প্রকাশ করে নিজের উপস্থিতির জানান দেন তিনি। ছবির সঙ্গে তিনি লেখেন, ‘দীর্ঘ তের বছর তের দিন পর আমাদের দেখা।’

কথা হয় দেশে থাকা উত্তম বড়ুয়ার কয়েকজন স্বজনের সঙ্গে। তারা নাম প্রকাশ না করে জানান, ঘটনার পর উত্তম বড়ুয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে ভারতে চলে যান। পরে ভারত থেকে ফ্রান্সে যান। বর্তমানে দেশে তার তেমন যোগাযোগ নেই।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উত্তম বড়ুয়া। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উত্তম বড়ুয়া। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ক্ষত ভুলে সম্প্রীতির বন্ধন

রামু উপজেলা সদরের চৌমুহনী স্টেশন থেকে মিনিট দুয়েক হেঁটে এগোলে পাশাপাশি চোখে পড়ে চারটি বৌদ্ধ বিহার। সবুজ গাছগাছালিতে ঘেঁরা মনোরম পরিবেশ। দৃষ্টিনন্দন নির্মাণশৈলী ও কারুকাজে সাজানো বিহারগুলো সহজেই দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে ঐতিহাসিক বৌদ্ধ পুরাকীর্তি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নানা নিদর্শন।

প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে থাকা লালচিং, সাদাচিং ও অর্পণাচরণ বৌদ্ধ মন্দির এবং মৈত্রী বিহার দেখে ১৪ বছর আগে এখানে কী ঘটেছিল, তা এখন বোঝার উপায় নেই। বর্তমানে এসব বিহারে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রার্থনার পাশাপাশি পর্যটকদেরও ভিড় দেখা যায়।

শুধু এই চারটি বিহার নয়। আশপাশের রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার, উত্তর মিঠাছড়ির ১০০ ফুট দীর্ঘ সিংহশয্যা ও প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারসহ বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে আনাগোনা বেড়েছে দর্শনার্থীদের।

বিহার সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৪ বছর আগে বিহারগুলোর অনেক স্থাপনা ছিল নান্দনিক কারুকাজ করা কাঠের তৈরি। হামলার পর নতুন করে নির্মাণের সময় ইট-সুরকি ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে স্থাপনাগুলো শক্তপোক্ত করা হয়েছে। তবে কাঠের পুরোনো কারুকাজের আদল ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্নাতকোত্তর করা জয়া বড়ুয়ার সঙ্গে। তার বাড়ি রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের পাশে। ২০১২ সালে তিনি কলেজে পড়তেন।

জয়া বড়ুয়া বলেন, সেই দিনের রাত যেন আমাদের জীবনে আর না আসে। মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। মনে হয়, সেটি ছিল একটি অভিশপ্ত রাত। রামুর অধিকাংশ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ সেই রাতের কথা আর মনে রাখতে চান না।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের পরিচালক শীলপ্রিয় থের বলেন, সেই রাতে আমাদের বৌদ্ধ বিহারগুলো ধ্বংস করা হয়েছিল। সেই সম্পদ ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। মনে পড়লে এখনও চোখে পানি আসে। কঠিন সময় গেছে আমাদের।

তিনি বলেন, হারিয়ে যাওয়া দিনের চেয়ে বর্তমানে আমরা অনেক বেশি সম্প্রীতি ভোগ করছি। রামুর মানুষ সম্প্রীতিতে আছে। আগামী দিনেও এই সম্প্রীতি ধরে রাখতে হবে।

রামুর কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
রামুর কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বিচারকাজে ধীরগতি

রামু বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধপল্লিতে সহিংসতার ঘটনায় রামু, কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফে ১৯টি মামলা হয়েছিল। একটি মামলা বাদী প্রত্যাহার করে নেন। ১৮টি মামলার বাদী ছিল পুলিশ। এসব মামলায় ৩৮৫ জনের নাম উল্লেখ করে ১৫ হাজার ১৮২ জনকে আসামি করা হয়। পুলিশ ১৮টি মামলায় ৯৯৩ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।

কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, মামলার বাদী ছিল পুলিশ। তদন্তও তারা করেছে। শুরু থেকে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ ছিল। তৎকালীন সরকার ও বিরোধীদলের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে এসব মামলায় বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনেকে মামলায় সাক্ষ্য দিতে আগ্রহ দেখাননি।

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের অভিযোগ, মামলার সাক্ষী ও আসামিদের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে, তাদের অনেকে জানেন না যে তাদের নাম সাক্ষীর তালিকায় রয়েছে। অনেক নিরীহ মানুষকেও আসামি করা হয়েছে।

কক্সবাজারের আইনজীবী সুমথ বড়ুয়া বলেন, পুলিশের করা মামলাগুলোয় অনেক নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে স্বাধীন তদন্ত বা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। তাহলে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। নিরীহরা হয়রানি থেকে মুক্তি পাবেন।

সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে উখিয়ার চারটি মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। বর্তমানে ১৪টি মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলায় কোনো কোনোটিতে পাঁচজন, আবার কোনো কোনোটিতে সাত থেকে ১০ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মূলত সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহের কারণে বিচার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।