লাউয়াছড়ায় ফুটেছে অপূর্ব বেগুনি রঙের ফুল কুডজু

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন সড়কের পাশে বড় বড় সবুজ পাতার ফাঁকে লম্বা মঞ্জরিতে ফুটে থাকতে দেখা যাচ্ছে বেগুনি রঙের অসাধারণ এক ফুল কুডজু। সাধারণত প্রতি বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ফুল ফোটে। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পথে প্রথম এই ফুলের দেখা মেলে বছর দুয়েক আগে। এর আগে স্থানীয়দের কাছে ফুলটি সম্পর্কে খুব একটা ধারণা ছিল না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অসাধারণ সৌন্দর্যময় এই ফুলগাছটির নাম কুডজু। লাউয়াছড়া ভ্রমণে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটক এবং পথচলতি স্থানীয় মানুষজন প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য দেখে বিমোহিত হচ্ছেন। কেউ কেউ গাড়ি থামিয়ে মুঠোফোনে অসাধারণ এই ফুলটির ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নিচ্ছেন।
বৃক্ষ গবেষকদের তথ্যমতে, কুডজু মূলত শিম বা মটরশুঁটি পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী আরোহী উদ্ভিদ। যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস, কিউ’-এর প্ল্যান্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড অনলাইন তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, এই প্রজাতিটির আদি বিস্তৃতি এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উত্তর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। বাংলাদেশও এর স্বাভাবিক বিস্তৃতির অন্তর্ভুক্ত।
এর ফুলগুলো সাধারণত লম্বা মঞ্জরিতে গুচ্ছাকারে সাজানো থাকে। পাপড়ির রং বেগুনি, গোলাপি-বেগুনি কিংবা লালচে-বেগুনি হতে পারে। ফুলের ওপরের বড় পাপড়ির গোড়ায় হলুদ দাগ বা অংশ দেখা যায়। উদ্ভিদবিজ্ঞানে শিমজাতীয় পরিবারের এ ধরনের ফুলকে প্রজাপতি-আকৃতির প্যাপিলিওনেশিয়াস ফুল বলা হয়। ফুলের পাপড়িগুলো নির্দিষ্ট বিন্যাসে থেকে প্রজননের উপযোগী কাঠামো তৈরি করে। কুডজু ফুলে সাধারণত মিষ্টি সুবাসও থাকে।
কুডজু লতা ও ফুল সম্পর্কে ময়মনসিংহের মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এবং প্রকৃতিবিষয়ক প্রখ্যাত লেখক-গবেষক চয়ন বিকাশ ভদ্র বলেন, প্রকৃতির উদ্ভিদজগতে এমন কিছু লতানো উদ্ভিদ রয়েছে, যাদের বৃদ্ধি ও বিস্তারের ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর। অল্প সময়ের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা সবুজে ঢেকে দিতে পারে তারা। তেমনই একটি উদ্ভিদ কুডজু। দ্রুতবর্ধনশীল এই বহুবর্ষজীবী লতা একদিকে যেমন মাটির আচ্ছাদন, পশুখাদ্য ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে, অন্যদিকে অনুকূল পরিবেশে অতিরিক্ত বিস্তারের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্ভিদজগতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
কুডজু উদ্ভিদটি পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে চীন, জাপান ও আশপাশের অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। অঞ্চলভেদে এর বিভিন্ন উপপ্রজাতি ও নাম প্রচলিত রয়েছে। উদ্ভিদটি মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। পর্যাপ্ত সূর্যালোক, আর্দ্রতা এবং উপযুক্ত মাটি পেলে এর লতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কুডজু একটি বহুবর্ষজীবী ও দ্রুতবর্ধনশীল আরোহী লতা। এর কাণ্ড লম্বা ও নমনীয় হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা কাষ্ঠল হয়ে ওঠে। উপযুক্ত পরিবেশে লতাগুলো প্রায় ১০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। মাটির ওপর ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি অন্য উদ্ভিদ, গাছের কাণ্ড কিংবা অন্য কোনো অবলম্বন আঁকড়ে ধরে এটি ওপরের দিকে উঠে যায়।
কুডজুর পাতার গঠন বেশ আকর্ষণীয়। প্রতিটি যৌগিক পাতা সাধারণত তিনটি প্রশস্ত পত্রক নিয়ে গঠিত। পত্রকগুলো ডিম্বাকার থেকে কিছুটা হৃৎপিণ্ডাকৃতির হতে পারে। প্রজাতি ও পরিবেশভেদে পাতার কিনারা অখণ্ড বা খাঁজযুক্ত দেখা যায়। পাতার সবুজ আচ্ছাদন উদ্ভিদটিকে সহজেই শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
এর ফুলও বেশ দৃষ্টিনন্দন। বেগুনি, গোলাপি-বেগুনি কিংবা লালচে-বেগুনি রঙের প্রজাপতি-সদৃশ ফুল লম্বা পুষ্পমঞ্জরিতে ফোটে। ফুলের পর চ্যাপ্টা শুঁটির মতো ফল তৈরি হয়, যার ভেতরে বীজ থাকে। অনুকূল পরিবেশে এ বীজ থেকে নতুন গাছ জন্মায়। তবে কুডজুর বিস্তারে শুধু বীজ নয়, মাটিতে ছড়িয়ে পড়া কাণ্ড ও শিকড়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এর শিকড় থেকে তৈরি স্টার্চ রান্নায় বা খাবার ঘন করতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া লতা থেকে তৈরি আঁশ দিয়ে বস্ত্র, কাগজ ও ঝুড়ি তৈরি করা যায়।
কুডজুর বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্রুত বৃদ্ধি ও বিস্তারের ক্ষমতা। অনুকূল পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত লতা দিনে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর বিস্তৃত শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে খাদ্য সঞ্চয় করে। মাটির সংস্পর্শে আসা কাণ্ডের গিঁট থেকেও নতুন শিকড় ও কুশি জন্মাতে পারে। ফলে একবার কোনো এলাকায় ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে উদ্ভিদটিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শিম গোত্রের অন্যান্য অনেক উদ্ভিদের মতো কুডজুর শিকড়েও নাইট্রোজেন স্থিরকারী ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে সহাবস্থান দেখা যায়। এসব অণুজীব বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেনকে উদ্ভিদের ব্যবহারযোগ্য যৌগে রূপান্তরে সহায়তা করে। ফলে নাইট্রোজেনের স্বল্পতা রয়েছে এমন মাটিতেও উদ্ভিদটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়।
কুডজুর নানা ব্যবহারিক গুরুত্ব রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির ক্ষয়রোধ, অনাবাদি জমি আচ্ছাদন এবং গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে উদ্ভিদটি চাষ করা হয়েছে। এর শিকড় থেকে শ্বেতসারসমৃদ্ধ উপাদান সংগ্রহ করা হয়, যা পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। শিকড়ের গুঁড়া ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন পানীয় ও খাদ্যেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তবে এর ঘন পাতার আচ্ছাদন ছোট গাছ, গুল্ম ও অন্যান্য উদ্ভিদের ওপর আলো পৌঁছাতে বাধা দেয়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ঢেকে রাখলে অনেক উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, এমনকি সেগুলো মারাও যেতে পারে। ফলে স্থানীয় উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে কুডজুর ব্যাপক বিস্তার এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।



