
পানির বুকজুড়ে লাল শাপলার মেলা। কোথাও থোকায় থোকায় ফুটে আছে ফুল, কোথাও সবুজ পাতার ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে রক্তিম আভা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, জলরাশির ওপর কেউ বিছিয়ে দিয়েছে লাল রঙের মখমল। বাতাসের মৃদু দোলায় ফুলগুলো দুলছে, আর সেই সৌন্দর্য দেখতে মানুষের ভিড় বাড়ছে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের গলহর বিলে।
শহরের কোলাহল, ব্যস্ততা আর ক্লান্তি পেছনে ফেলে মানুষ ছুটে আসছেন এই জলজ সৌন্দর্যের টানে। কেউ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছেন, কেউ নৌকায় ভেসে ঘুরছেন শাপলার রাজ্যে, কেউ আবার পানিতে নেমে ফুলের পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামেরাবন্দি করছেন নিজেদের মুহূর্ত। লাল শাপলার রঙে রঙিন হয়ে উঠছে মানুষের অবসর।
তবে এই অপরূপ সৌন্দর্যের ভেতরেই উঁকি দিচ্ছে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। যে প্রকৃতির টানে মানুষ এতটা পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে আসছেন, সেই ফুলই যদি অসচেতন পর্যটকদের হাতে ছিঁড়ে নষ্ট হয়, তবে আর কত দিন টিকে থাকবে গলহর বিলের এই প্রাকৃতিক রূপ?
স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমী ও সচেতন মহলের মতে, পর্যটকদের অবাধ ভিড় এবং ফুল ছেঁড়ার প্রবণতা রোধ করা না গেলে অচিরেই বিবর্ণ হয়ে যাবে বিলের এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। এখনই সঠিক পদক্ষেপ ও সচেতনতা তৈরি না হলে হারিয়ে যেতে পারে লাল শাপলার এই অনন্য অভয়ারণ্য।
প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীর আগমন বিলটিকে নতুন পরিচিতি দিচ্ছে। পাশের চেচুয়া বিলেও ফুটেছে শাপলা। দুই বিল মিলিয়ে পুরো এলাকাই যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ। শাপলা ঘিরে তৈরি হওয়া এই সৌন্দর্য স্থানীয় পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

পার্শ্ববর্তী ভালুকা উপজেলা থেকে আসা দর্শনার্থী জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘ফুলের সৌন্দর্য আমার কাছে সব সময়ই ভালো লাগে। কাছাকাছি দূরত্বে শাপলা ফুলের বিশাল সমাহার দেখে আমি অভিভূত। শত শত মানুষকে একসঙ্গে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেখে সত্যিই ভালো লাগছে। আমার মতো অনেক দর্শনার্থীর কাছেই গলহর বিল এখন প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানোর আকর্ষণীয় জায়গা।'
আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী আসিফ মাহমুদ বিলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বলেন, গলহর বিল এখন লাল শাপলার রাজ্য। যত দূর চোখ যায়, পানির বুকে ছড়িয়ে আছে রক্তিম ফুলের সমারোহ। সবুজ প্রকৃতির মাঝে লাল শাপলার এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন আমার মতো অসংখ্য মানুষ। কিন্তু সেই সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যদি উপেক্ষিত থাকে, তবে একদিন হয়তো মানুষ আসবেন, দাঁড়াবেন, কিন্তু জলরাশিতে আর আগের মতো শাপলার সমারোহ খুঁজে পাবেন না।

এছাড়া দর্শনার্থীদের অভিযোগ, বিলের শাপলা কাছ থেকে দেখতে গেলে কাদামাখা আইল ধরে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়। কোথাও কোথাও চলাচলও বেশ কষ্টকর। পানিতে নেমে ফুলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে। এতে পোশাক ভিজে যাওয়া কিংবা পিচ্ছিল জায়গায় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, নৌকায় ঘোরার ব্যবস্থা থাকলেও ভাড়া নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। দর্শনার্থীদের কাছে নৌকাভাড়া নির্ধারণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা না থাকলে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয়রা জানান, স্থানীয়ভাবে শাপলা তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেক দর্শনার্থী তা মানছেন না। ফুলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো ফুল ছিঁড়ে নেওয়ার প্রবণতায় রূপ নিচ্ছে। একটি ফুল ছিঁড়ে নেওয়া হয়তো একজনের কাছে সামান্য ব্যাপার। কিন্তু শত শত মানুষ একই কাজ করলে বিলে ফুলের সংখ্যা নিয়ে সংশয় তৈরি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমরা চাই, এই এলাকা একটি স্থায়ী পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হোক। ফুল দেখতে এসে ১০-২০টা করে ফুল ছিঁড়ে নিলে তো সমস্যা। এ জন্য প্রয়োজন ফুল সংরক্ষণ, অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রশাসন সহযোগিতা করলে কাজটি আরও সহজ হবে।’
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন উন্নয়ন আন্দোলন ময়মনসিংহের সভাপতি অধ্যক্ষ লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দীন বলেন, প্রকৃতি মানুষকে সৌন্দর্য উপহার দেয়, কিন্তু সেই সৌন্দর্য চিরকাল অক্ষত রাখার নিশ্চয়তা দেয় না। তাকে টিকিয়ে রাখতে হয় যত্নে, সংযমে এবং দায়িত্বশীল আচরণে। পরিচিতি বাড়লেই কোনো জায়গা পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠে না। প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ চলাচল, নির্ধারিত ভাড়া, পর্যাপ্ত নির্দেশনা এবং প্রকৃতি রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা। বিলের প্রবেশপথে ফুল না ছেঁড়ার নির্দেশনা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্কতামূলক চিহ্ন, নৌকাভাড়া প্রকাশ এবং নিয়মিত নজরদারির মতো উদ্যোগ দিয়েই শুরু করা সম্ভব। স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটকসেবায় যুক্ত করা গেলে প্রকৃতি সংরক্ষণ ও জীবিকার মধ্যে সমন্বয়ও তৈরি হতে পারে।

প্রকৃতি জীবন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. মামুন রানা বলেন, গলহর বিলের লাল শাপলা আজ মানুষকে ডাকছে। আগামী বছরও সেই ডাক যেন একই রকম মায়াময় থাকে, সেই দায়িত্ব এখন দর্শনার্থী, স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসন সবার। একটি ফুল না ছেঁড়াও ভালোবাসার প্রকাশ হতে পারে। বরং ফুলটিকে তার জায়গায় রেখে আসাই হতে পারে প্রকৃতির প্রতি সবচেয়ে সুন্দর উপহার। কারণ গলহর বিলের আসল সৌন্দর্য কারও হাতে তুলে নেওয়া একটি শাপলায় নয় সৌন্দর্য তার পানির বুকে ফুটে থাকা অগণিত লাল শাপলায়। সেই সমারোহ বেঁচে থাকলেই বেঁচে থাকবে বিলের মায়া, মানুষের মুগ্ধতা এবং ত্রিশালের প্রকৃতির এই অনন্য পরিচয়।
এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ্ হাসনাত জাহান জানিয়েছেন, বিলটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও ফুল সংরক্ষণে গ্রাম পুলিশ মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
গলহর বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাতায়াতের পথও খুব জটিল নয়। ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড থেকে বালিপাড়া সড়ক ধরে অটোভ্যানে ঠাকুরবাড়ি মোড় পর্যন্ত যেতে হয়। ভাড়া ১০ টাকা। সেখান থেকে হেঁটে কিংবা ভ্যানে করে বিলে পৌঁছানো যায়। এরপর উপভোগ করা যাবে গলহরসহ পাশেই থাকা চেচুয়া বিলের সৌন্দর্য।
