অপ্রতিম হত্যা/আরেক কিশোরকে ডেকে মোটরসাইকেল কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ তুহিনের বিরুদ্ধে

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলায় তুহিন হোসেন নামে এক যুবককে আটকের পর তার বিরুদ্ধে পুরোনো একটি মোটরসাইকেল কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় করা একটি লিখিত অভিযোগে তুহিনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
মরিয়ম আক্তার নামের এক নারী ওই অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, তার ছেলে সোহাগের সঙ্গে তুহিনের পূর্বপরিচয় ছিল। সোহাগ ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি সুজুকি মোটরসাইকেল কেনেন। তুহিন মাঝেমধ্যে ওই মোটরসাইকেলটি চালাতেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তুহিন ফোন করে সোহাগের কাছে মোটরসাইকেলটি চান। পরে সদর দক্ষিণের সালমানপুর এলাকার অলি মিয়ার দোকানের সামনে সোহাগ মোটরসাইকেলটি তুহিনের কাছে দেন। এরপর সোহাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একটি দোকানে গিয়ে বসেন। কিছুক্ষণ পর তুহিন তাকে জানান, মোটরসাইকেলটি তার কাছে নেই। পরে মোটরসাইকেলটি আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করার পর থানায় অভিযোগ করা হয়। এ কারণে অভিযোগ করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আসাদুল্লা সোহাগ নামের এই তরুণ তুহিনের আটকের খবরের পর তার ব্যক্তিগতর ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন তুহিন তাকেও একইভাবে ডেকে নিয়ে তার মোটরসাইকেল নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, এ ঘটনায় মামলা করতে সদর দক্ষিণ থানায় গেলে মামলা না নিয়ে শুধু সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়া হয়েছিল।

ওই পোস্টে আরও দাবি করা হয়, তুহিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ হিসেবে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি রাজনৈতিক দলের বড় নেতার প্রভাবের কথা বলা হয়েছিল।
সম্প্রতি অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তুহিন হোসেনসহ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। এর পরই তার বিরুদ্ধে আগের মোটরসাইকেল-সংক্রান্ত অভিযোগটি সামনে আসে।
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোটবাড়ি ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে তুহিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। অল্পবয়সী কিশোরদের সঙ্গেও তার নিয়মিত ওঠাবসা ছিল বলে দাবি তাদের।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদকসহ আটক সাত কিশোরের কয়েকজনের সঙ্গেও তুহিনের চলাফেরা ছিল। ওই সময় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম।
তুহিনের বাড়ির পাশের এক নারী বলেন, বাড়িতে তুহিন শান্ত থাকলেও বাইরে বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে মিশতেন। তার বিরুদ্ধে আগে বন্ধুদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগও ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক নারী বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার দিন সকালেও তুহিনকে সাইকেল নিয়ে ঘুরতে দেখেছেন। তার বাবার হাতে তুহিনের মারধরের শিকার হওয়ার কথাও বলেন ওই নারী।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের স্থানটির কাছেই তুহিনদের একটি মুরগির খামার রয়েছে। তুহিনের বাড়িতে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে তার এক খালা দুপুরে বাড়িতে আসার কথা জানালেও তুহিনের আচরণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিষয়টি দেখে বলতে হবে। এটার বিস্তারিত জেনে জানাব।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। সন্ধ্যার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে অপ্রতিমের বাবা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজ ছেলের সন্ধান চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকুতি জানান তার মা।
শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পাশের একটি নির্জন স্থানে অপ্রতিমের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় কয়েকজন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে তাদেরকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাটি তদন্তে পুলিশ কিছু ‘ক্লু’ পেয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তবে আটক ব্যক্তিরা ঘটনায় জড়িত কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও এখনও পাওয়া যায়নি। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে জড়িত, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।


-0834ee.jpg)
