কুষ্টিয়া/যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে ৫০ বছরের পুরোনো মার্কেট

কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্র এনএস রোডের অত্যন্ত ব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত কুষ্টিয়া হাইস্কুলের আব্দুল ওয়াহেদ সুপার মার্কেট। প্রায় পাঁচ দশক আগে নির্মিত এই মার্কেট ভবনটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। একপাশে হেলে পড়েছে ভবনটি; ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে নিয়মিত। যেকোনো সময় ভবনটি ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, ১৯৭৬ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত মার্কেটটিতে বর্তমানে প্রায় ৫০টি দোকান রয়েছে। ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা চোখে পড়লেও নিরুপায় হয়ে সেখানেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন দোকানিরা। তবে ভবনের বেহাল দশার খবর ছড়িয়ে পড়ায় ক্রেতাদের উপস্থিতি আগের তুলনায় কমে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মার্কেটের বিভিন্ন স্থানে ভবনের পুরোনো কাঠামোর ক্ষয়চিহ্ন স্পষ্ট। ছাদ ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশের পলেস্তারা খসে পড়েছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো স্থাপনার বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে জরাজীর্ণতা। দুই তলা বিশিষ্ট এই মার্কেটের বারান্দা একদিকে হেলে পড়েছে। মানুষের পায়ের নড়াচড়াতেও ভবনটি কাঁপতে থাকে।
ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, ভবনের ভেতরে চলাচলের সময়ও তারা চরম আতঙ্কে থাকেন।
বিদ্যালয় ও মার্কেট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের দিকে মার্কেটটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়টি নজরে আসে। তখন বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতিকে বিষয়টি অবহিত করার পর তিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং একজন প্রকৌশলীকে দিয়ে ভবনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য করণীয় নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকৌশলীর মতামত ছিল—পুরোনো কাঠামো সংস্কার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, ভবনটি সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে জটিলতা।
বিদ্যালয় সূত্র বলছে, মার্কেটের দোকানমালিকদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম হারে ভাড়া নেওয়া হয়। ১৯৭৬-৭৭ সালের নির্ধারিত হারের ভিত্তিতে বর্তমানে অধিকাংশ দোকানের ভাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। ফলে এই ভাড়া থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে এত বড় স্থাপনা নতুন করে নির্মাণ করা বিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ প্রতিদিনই সেখানে ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও ক্রেতাদের সমাগম ঘটে। ফলে ভবনটি ধসে পড়লে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
ব্যবসায়ী শরিফ বলেন, প্রতিদিন দোকান খুলে বসি ঠিকই, কিন্তু মনে ভয় কাজ করে। ভবনের যে অবস্থা, কখন কী ঘটে বলা যায় না। ব্যবসা না করলে সংসার চলবে না, আবার দোকানে বসেও নিরাপদ বোধ করি না। এখন ক্রেতারাও ভবনের অবস্থা দেখে আগের মতো আসতে চান না।
আরেক ব্যবসায়ী মমিন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে ব্যবসা করছি। মার্কেটটি পুরোনো, এখন ভবনের অবস্থা খুবই খারাপ। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে, ভবন দুলে ওঠে। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নতুন ভবন হলে ব্যবসায়ীরাও নিরাপদে ব্যবসা করতে পারবেন, ক্রেতারাও স্বস্তিতে আসবেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজন বলেন, মার্কেটের ভবনটি যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা বাইরে থেকেই বোঝা যায়। একপাশে হেলে আছে, পলেস্তারা খসে পড়ছে। এত মানুষের চলাচলের জায়গায় এমন একটি ভবন এভাবে পড়ে থাকা খুবই উদ্বেগের বিষয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই ভবনটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
কুষ্টিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সাবানা ইয়াছমিন বলেন, পুরোনো মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছেন। ব্যবসায়ীরা বিদ্যালয়কে মূলত জমির ভাড়া দেন। ১৯৭৬-৭৭ সালের হিসাবে ভাড়া নির্ধারিত ছিল এবং দীর্ঘ সময় পর পর সামান্য হারে তা বাড়ানো হয়েছে। ফলে কারও ভাড়াই ৫০০ টাকার বেশি নয়। এই আয় দিয়ে পুরো মার্কেট নতুন করে নির্মাণ করা বিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। বর্তমান জেলা প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকেও মার্কেটের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা জানানো হয়েছে। গত ১১ আগস্ট জেলা প্রশাসক মার্কেটটি পরিদর্শন করেছেন।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক ও বিদ্যালয়টির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি ভবনটি দেখে এসেছি। ভবনটি পুরোনো, তাই প্রকৌশলীর মাধ্যমে এর বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা হবে। প্রকৌশলী যদি ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন, তাহলে আমরা পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।


