logo
Advertisement

ঝড়ের কবলে সীমান্ত পার, মিয়ানমারে আটক ৯ বাংলাদেশি জেলে

আতোয়ার রহমান মনির
রামগতি, লক্ষ্মীপুর
ঝড়ের কবলে সীমান্ত পার, মিয়ানমারে আটক ৯ বাংলাদেশি জেলে
মিয়ানমারে আটক ৯ বাংলাদেশি জেলের অপেক্ষায় তাদের পরিবার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

‘ভাতের জন্য, সংসারের অভাব মিটাতে সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় বলেছিল— মা, দোয়া করিও, আমরা ফিরব। ছয় মাস পর এক ছেলে ফিরলেও আরেক ছেলে এখনো ফেরে নাই। এখন শুধু পথের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার বুকের মানিককে ঘরে ফিরিয়ে দিন’— কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরপোড়াগাছা এলাকার কোহিনূর বেগম।

তার দুই ছেলে তামজিদ ও তাহমিদ সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হন। সম্প্রতি ছোট ছেলে তাহমিদ দেশে ফিরলেও মিয়ানমারের কারাগারে এখনো বন্দি বড় ছেলে তামজিদ।

শুধু কোহিনূর বেগম নন, দীর্ঘদিন ধরে স্বজনদের বন্দিত্বে তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন রামগতি ও কমলনগরের আরও আটটি জেলে পরিবার। উপার্জনক্ষম মানুষগুলো বন্দি থাকায় পরিবারগুলোতে চরম আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে। কারো ঘরে খাবারের হাহাকার, আবার কেউ সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

চোখের জলে ভেজা আঁচলে ছেলের ছবি মুছতে মুছতে মা কোহিনূর বেগম বিলাপ করে বলেন, গত রোজার ঈদের পরদিন সাগরে গেলে দুই ভাইসহ কক্সবাজার সীমান্ত থেকে ১০ জনকে ধরে নিয়ে যায় মিয়ানমার বাহিনী। ধারদেনা করে ছোট ছেলেকে ফিরিয়ে আনলেও বড় ছেলে এখনো তাদের কারাগারে বন্দি। ছয়-সাত মাস ধরে তিনি পথচেয়ে আছেন।

দীর্ঘ বন্দিত্বের পর সম্প্রতি দেশে ফেরা কোহিনূর বেগমের ছোট ছেলে তাহমিদ মিয়ানমারে আটক থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে শিউরে ওঠে। কিশোর তাহমিদ জানায়, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে তারা মিয়ানমার জলসীমায় ঢুকে পড়ে। পরে মিয়ানমার বাহিনী তাদের আটক করে। বয়স কম হওয়ায় তাকে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির জিম্মায় দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় সে দেশে ফেরে। তবে তার ভাইসহ বাকিরা এখনো সেখানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

একই এলাকার জেলে জাবের হোসেনের স্ত্রী রাশেদা বেগমের সংসারেও নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। তিন সন্তান নিয়ে স্বামীর অপেক্ষায় দিন কাটছে তার। সংসারের খরচ চালাতে তাকে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হচ্ছে। শিশুরা প্রতিদিন বাবার খোঁজ জানতে চাইলে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা পান না তিনি। রাশেদা বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, সাত মাস ধরে স্বামীর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। একবেলা খেলে আরেক বেলা খাবারের চিন্তা করতে হয়। সরকারের কাছে মিনতি, আমার স্বামীকে সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে দিন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ মার্চ ‘মা-বাবার দোয়া’ নামের একটি ট্রলারে লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের ১৬ জন জেলে মহেশখালীর হোয়ানক থেকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। পরদিন থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে ২৮ মার্চ মহেশখালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ট্রলার মালিক মিজানুর রহমান।

মিয়ানমারে বন্দি লক্ষ্মীপুরের জেলেরা হলেন— মো. জুয়েল, ফরহাদ হোসেন, মো. নিরব, মো. রাকিব হোসেন, সাদ্দাম হোসেন, মো. মেজবাহ উদ্দিন, মো. তামজিদ, মো. লিটন এবং কমলনগরের মো. অজি উল্যাহ।

রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দীন জানান, বন্দি জেলেদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তার উদ্যোগও নেওয়া হবে।