logo

খুলনা/মৃত্যুর আগে আজমুলের কাছে ৫৮ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল, অভিযোগ বাবার

মাসুম বিল্লাহ ইমরান
খুলনা
মৃত্যুর আগে আজমুলের কাছে ৫৮ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল, অভিযোগ বাবার
শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেন। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনের মৃত্যুর আগে তার কাছে ৫৮ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন তার বাবা মো. কুতুবউদ্দিন। তার অভিযোগ, মেডিকেলে ভর্তির প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় দেড় বছর ধরে মেহেদী নামে এক ব্যক্তি আজমুলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। পরে আজমুল নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার খবর জানতে পেরে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। ঘটনার দিন দুপুরে টাকা চাওয়ার পরই আজমুলের মৃত্যু হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।

কুতুবউদ্দিন জানান, এসএসসি পাসের পর কয়েকটি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেও আজমুল কোথাও সুযোগ পাননি। ওই সময় মেডিকেলের শিক্ষার্থী মেহেদীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। চার বছর পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দেওয়ার কথা বলে মেহেদী এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তি করেছিলেন বলে অভিযোগ বাবার। বিষয়টি কাউকে জানালে আজমুলকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

নিহতের বাবা বলেন, মেহেদী বলেছিল, চার বছর পর সার্টিফিকেট দিয়ে দেবে। এ নিয়ে এক লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তি হয়। কাউকে জানালে মেরে ফেলবে বলেছিল। আমার ছেলে আমাকে বলেছিল সে চান্স পেয়েছে। ছেলেকে বিশ্বাস করে ভর্তি বাবদ টাকা দিই। পরে জানতে পারি, সে আসলে চান্স পায়নি।

পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে আজমুলকে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। এ খবর জানতে পেরে শুক্রবার আজমুলকে ডেকে নেন মেহেদী।

কুতুবউদ্দিন বলেন, শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে ছেলে ফোন করে বলে, আব্বু আমার কাছে ৫৮ হাজার টাকা পাঠাও। আমি বলি, আমার কাছে এত টাকা নেই। তখন সে জানতে চায় কত দিতে পারব। আমি বলি, ২৩ হাজার টাকা দিতে পারব। সে বলে, ২৩ হাজার টাকাই পাঠাও, এখানে একটা পিকনিক আছে, তুমি জলদি চলে আসো। এরপর আমার ছেলেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মেহেদীকে গ্রেপ্তার করা গেলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য বের হবে। তার সঙ্গে আর কেউ জড়িত থাকতে পারে।

মামলার বিষয়ে কুতুবউদ্দিন বলেন, মামলার এজাহার দেওয়ার সময় আমি মেহেদীর নাম জানতাম না। ছেলে যে মেসে থাকত, সেখানে আমি কখনো যাইনি। শুক্রবার যখন টাকা চাওয়া হয়, তখনও আমি জানতাম না যে ওই ব্যক্তির নাম মেহেদী।

আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পুলিশ এখনও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফোনে জানিয়েছেন, তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

পরিবারের এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের অভিযোগসহ ঘটনার সব দিক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে আজমুলকে মেসের ছাদে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে থাকা অভিযুক্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীর দাবি, চুরির অভিযোগে আজমুলকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। মেস থেকে শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, জুতা ও টাকা চুরির কথা আজমুল স্বীকার করেছিলেন বলেও দাবি তাদের।

তাদের একজন রিফাত বলেন, প্রথমে লাউডস্পিকারে তাকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। সে বাবাকে জানায়, চুরির সময় ধরা পড়েছে। পরে ফোনটি আমাকে দিলে আমি তার বাবাকে বলি, আপনার ছেলে এই কাজ করছে, আপনার আসা উচিত। কালকে এসে একটা ব্যবস্থা করেন। ওকে তো আর এখানে রাখা যাবে না।

তাদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আজমুল ছাদের কার্নিশের দিকে গিয়ে নিচে লাফ দেন। সেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় জায়গাটি পিচ্ছিল ছিল। লাফ দেওয়ার পর তাদের আর ধরার সুযোগ ছিল না। পরে রাত ১২টার দিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে আজমুলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তবে মেসের অন্য শিক্ষার্থীদের বক্তব্য আলাদা। তাদের দাবি, চুরির চাদর তুলে আজমুলকে ছাদে নিয়ে চড়-থাপ্পড় ও মারধর করা হয়। কেটে দেওয়া হয় তার চুলও। নির্যাতনের একপর্যায়ে আজমুল ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান।

শামীম নামের আরেক শিক্ষার্থী জানান, শুরুতে ছাদে ১০-১২ জন থাকলেও পরে আরও অনেকে আসে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে মারধর ও চুল কেটে দেওয়ার পর একপর্যায়ে আজমুল উঠে দাঁড়িয়ে ছাদ থেকে লাফ দেন।

টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে এক অভিযুক্ত শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের কেউ টাকা দাবি করবে—এটা অসম্ভব। আমাদের পরিকল্পনা ছিল তাকে পুলিশে দেওয়ার। ঘটনার সময় ছাদে ১৫-২০ জন ছিল। সে লাফ দেওয়ার পর সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়ে।

নিহতের পরিবারের দাবি, চুরির ক্ষতিপূরণ হিসেবে আজমুলকে আটকে রেখে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল এবং টাকা চাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে এ অভিযোগের সত্যতা পুলিশ এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি।

ঘটনার পর ওই মেসে গিয়ে ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থতলার কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। থমথমে ওই দুইতলার বাসিন্দাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। ভবনের তত্ত্বাবধায়ক আকিবুর হোসেন জানান, ঘটনার পর থেকেই বাসিন্দারা কেউ সেখানে নেই। বাড়ির মালিক সরোয়ার হোসেন চট্টগ্রামে চাকরি করায় বর্তমানে বাড়িটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মেহেদী হাসান।

মেসের বাবুর্চি ফাতেমা বেগম বলেন, ঘটনার সূত্রপাত খাবার নিয়ে। এর আগেও মেস থেকে জিনিসপত্র হারানোর বিষয় নিয়ে আজমুলের ওপর কয়েকজনের ক্ষোভ ছিল। তা নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু বকর বলেন, শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে বিকট শব্দ শুনে গলি বের হয়ে একজনকে পড়ে থাকতে দেখি। পরে মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

আজমুলের মৃত্যুর ঘটনায় শুক্রবার রাতে হরিণটানা থানায় মামলা করেছেন তার বাবা মো. কুতুবউদ্দিন। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত চার আসামি হলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের মো. রবিন ও মো. মুবিন, গণিত ডিসিপ্লিনের মো. সাগর এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের মো. ওবায়দুল। তবে পরিবারের মূল অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, সেই মেহেদী হাসানের নাম এজাহারে নেই।

হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, এজাহারভুক্ত আসামিদের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আজমুলকে কীভাবে মারধর করা হয়েছে, ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলা হয়েছে নাকি অন্য কীভাবে পড়েছে—সবই তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও আলামত বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করা হবে।