অবসরে বিক্রি করেন সবজি/বিনা বেতনে পাঠদান, এভাবে কেটে গেছে ২৮ বছর

বেতন ছাড়া শিক্ষার্থীদের পাঠদান করান তিনি। এক-দুই বছর নয়, এভাবে কেটে গেছে ২৮ বছর। এতগুলো বছরের শিক্ষকতা জীবনে প্রতিষ্ঠানটি থেকে নেননি কোনো আর্থিক সহযোগিতা। নাম তার ইসমাইল হোসেন।
প্রতিদিন সকাল হলে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে পড়েন তিনি। গন্তব্য ভবানীগঞ্জ হাটমাধনগর আলিম মাদ্রাসা। বাড়ি থেকে প্রতিষ্ঠানটির দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। পকেটে টাকা থাকুক কিংবা না থাকুক, শিক্ষার্থীদের পড়াতে প্রতিদিন ছুটে যান তিনি। কখনও পায়ে হেঁটে, কখনও যানবাহনে; সময়মতো পৌঁছে যান কর্মস্থলে।
১৯৯৮ সালে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ হাটমাধনগর আলিম মাদ্রাসায় প্রভাষক পদে শিক্ষকতা শুরু করেন ইসমাইল হোসেন। বিনা বেতনে শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। শিক্ষকতা তার কাছে শুধু পেশা নয়, যেন এক ধরনের দায়বদ্ধতা। নিজের জীবনে অভাব থাকলেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান থেকে কখনও পিছিয়ে যাননি।
জীবন-জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতার পাশাপাশি অবসর সময়ে উপজেলার বিভিন্ন হাটে পাইকারি দরে সবজি বিক্রি করেন ইসমাইল হোসেন। ভোরে বা ছুটির দিনে সবজি নিয়ে হাটে চলে যান ইসমাইল। বিক্রি শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে চলে চার সদস্যের সংসার।
তার পরিবারের সদস্য চারজন। বড় ছেলে বেল্লাল রাজশাহীর একটি কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ছোট ছেলে ইশতিয়াক পৌরসভার একটি বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার আয় অনিয়মিত হওয়ায় দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতেও হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় প্রয়োজনীয় বই-খাতা, শিক্ষা উপকরণ কিংবা অন্যান্য খরচ সময়মতো দিতে পারেন না। তবুও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করতে চান না এই শিক্ষক।
ইসমাইল হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়ানো আমার সবচেয়ে বড় শান্তি। অনেক কষ্ট হয়। সংসার চালাতে গিয়ে সবজি বিক্রি করতে হয়। তারপরও যখন শিক্ষার্থীদের পড়াতে যাই, তখন মনে হয় আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি। পকেটে টাকা না থাকলেও চেষ্টা করি মাদ্রাসায় পৌঁছাতে।
তিনি বলেন, আমি চাই না আমার কারণে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় সমস্যা হোক। নিজের কষ্ট থাকলেও তাদের পড়ানো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারি না।
প্রতিবেশীরা জানান, তাকে কখনও শিক্ষকতার অহংকার করতে দেখেননি। নিজের আর্থিক সংকটের কথা কাউকে না বলে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
প্রতিবেশী ইসরাফিল জানান ভাষায়, ইসমাইল হোসেনের সংসারেই অভাব। তারপরও তিনি বছরের পর বছর ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে যাচ্ছেন। অনেক সময় তাকে হেঁটে মাদ্রাসায় যেতে দেখেছি।
আরেক প্রতিবেশী সিরাজুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষককে সংসার চালানোর জন্য হাটে গিয়ে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে—এটা সত্যিই কষ্টের। অথচ তিনি শিক্ষকতা ছাড়েননি।
তিনি আরও বলেন, তার নিজের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কষ্ট হয়। তারপরও শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে নিয়মিত মাদ্রাসায় যান। এমন মানুষকে সমাজের সহযোগিতা করা দরকার।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ড. সাদিকুর রহমানের মতে, একজন শিক্ষক প্রায় তিন দশক ধরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন, অথচ তার নিজের জীবন যদি আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তাহলে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরি নয়, এটি জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই দীর্ঘ দিন ধরে যারা শিক্ষকতা করছেন, তাদের চাকরি ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি মানবিক এবং প্রশাসনিক—দুই দিক থেকেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ইসমাইল হোসেনের ঘটনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—যে শিক্ষক অন্যের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছেন, তার নিজের ভবিষ্যতের দায়িত্ব কে নেবে।
আরেক শিক্ষাবিদ সালাউদ্দিন বাদল বলেন, একজন শিক্ষককে দিনের এক সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করাতে হচ্ছে, অন্য সময় সংসার চালাতে হাটে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে—এটি কোনোভাবে কাম্য নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি তদন্ত করে দেখা, তিনি কেন এত বছর ধরে বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত এবং তার চাকরির স্বীকৃতি ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কোনো আইনি বা প্রশাসনিক পথ আছে কি না।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসমাইল হোসেনের মতো একজন শিক্ষককে সহযোগিতা করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা নয়; বরং শিক্ষার প্রতি সমাজের দায়বদ্ধতাকে সম্মান করা।
